চেনা বাঁশের অচেনা রূপ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ ও পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বাঁশ জন্মায়। এর মধ্যে গাঢ় সবুজ রঙের বাঁশই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গেছে যে, বাঁশ কেবল সবুজ রঙেরই হয়। তবে এই ধারণাকে বদলে দিতে পারে সোনালি বা হলুদ রঙের বাঁশ, যা হঠাৎ দেখলে যে কেউ চমকে উঠবেন। আমাদের দেশের কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও চা-বাগানে এই বিশেষ প্রজাতির সোনালি বাঁশ রয়েছে, যার সংখ্যা খুবই সীমিত। এটি একটি বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী বাঁশ। পাতলা সবুজ পাতা আর সোনালি-হলুদ কা-ের চমৎকার বৈপরীত্যের জন্য এটি দারুণ আকর্ষণীয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানে বাঁশটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘ফিলোস্টাকিস অরিয়া’, আর সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘সোনালি বাঁশ’ বা ‘মাছের খুঁটির বাঁশ’ নামে পরিচিত। কয়েক বছর আগেও এই বাঁশ বাংলাদেশে বিরল ছিল। কিন্তু বর্তমানে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা-বাগান এবং দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এর দেখা মিলছে।

বন বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পোয়াসি পরিবারের বা ঘাস পরিবারের এ প্রজাতির বাঁশটির উৎপত্তিস্থল চীনে। তবে কারও কারও দাবি এটির উৎপত্তিস্থল জাপানে। চীন দেশের সংস্কৃৃতিতে শক্তি এবং সম্পদের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বাঁশটিকে। বিভিন্ন জলবায়ুুর সঙ্গে এ জাতের বাঁশের অভিযোজন ক্ষমতা এবং দ্রুত বৃদ্ধি হলো এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। সোনালি বাঁশ দিয়ে সাধারণ বাঁশের মতো গৃহসহ নানাবিধ নির্মাণ, বাসন তৈরি করা হয়ে থাকে। এটি মাটির স্থিতিশীলতা এবং কার্বন স্থিরকরণের মতো পরিবেশগত সুবিধাগুলোতে প্রয়োগ করা হয়। এ বাঁশটি খুবই শব্দ হওয়ায় নির্মাণে এটি দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে। বাঁশটির উচ্চতা ২৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কা-ের ব্যাস ১.৫ ইঞ্চি, পাতা চিরসবুজ, সোনালি-হলুদ বেতসহ বৃদ্ধির হার দ্রুত বর্ধনশীল। সোনালি বাঁশ গুচ্ছাকারে জন্মে এবং ছোট জায়গায় অনেক বাঁশ হয়ে থাকে। দেখতে অসাধারণ এ বাঁশটি ঘন ঝোপ তৈরি করে। এ বাঁশটিতে রয়েছে বিশেষ জৈব-সক্রিয় উপাদান। ফলে বাঁশটি মানবদেহের কিছু সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়ক। এছাড়া সোনালি বাঁশ হজমের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসেবে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সোনালি বাঁশটি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিয়ন্ত্রণাধীন মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহ মো. লুৎফুর রাহমান জানান, মৌলভীবাজার জেলায় বিভিন্ন স্থানে দেশীয় জাতের বাঁশের সঙ্গে তুলনামূলক কমসংখ্যক সোনালি বাঁশ দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে চা-বাগান অঞ্চলে এ বাঁশটি রয়েছে। যেহেতু বাঁশ, গাছ ইত্যাদি গবেষণা, সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে বন বিভাগ, সেহেতু তারাই এটি সম্পর্কে বলতে পারবে।’

সিলেট বন বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সালাহ্ উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বে প্রায় ৩০০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। আমাদের দেশেও রয়েছে প্রায় শতাধিক প্রজাতির বাঁশ। তার মধ্যে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট ৩৩ প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষণ করেছে। মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলগুলোতে সোনালি বাঁশের প্রজাতি নেই। তবে এ জেলার চা-বাগানগুলোতে এবং সীমান্ত অঞ্চলে কিছু সোনালি বাঁশ দেখতে পাওয়া যায়। সিলেট বন বিভাগের পক্ষ থেকে সিলেটের বিভিন্ন বন রেঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে বাঁশ বাগান করা হচ্ছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া। এছাড়া আমাদের জুড়ী ও কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রাকৃতিক বাঁশ বাগান রয়েছে। এসব বনাঞ্চলেও নেই সোনালি প্রজাতির বাঁশ। জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সোনালি বাঁশ না থাকলেও যেসব চা-বাগানে সোনালি বাঁশ রয়েছে যতটুকু সম্ভব আমরা খোঁজখবর রাখি। সোনালি বাঁশটির প্রজাতি যাতে নষ্ট না হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চা বাগান কর্তৃপক্ষ ফ্রি পারমিটে সোনালি বাঁশসহ অন্যান্য বাঁশ কাটতে চাইলে সে ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট বাইন্ডিংস আছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত