বালুদস্যুর কবলে কৃষিজমি

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ড্রেজার মেশিনে দেদার মাটি ও বালু কাটা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এই ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ এই খননকাজ চলায় একদিকে যেমন শত শত একর উর্বর কৃষিজমি চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মালিগাঁও, দক্ষিণনগর, চাপাতুলি, বায়নগর এবং থৈরখোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে একাধিক ড্রেজার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব গ্রামে বসানো হয়েছে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন, যা দিয়ে ফসলি জমির বুক চিরে গভীর থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব মেশিন দিয়ে ফসলি জমি থেকে গভীরভাবে মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে জমি ভরাট করে তা বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে পড়ছে, জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অপরদিকে ড্রেজারের পাইপলাইন সড়কের ওপর দিয়ে টানায় যান চলাচলে বিঘœ ঘটছে। মাঝে মাঝে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করে কিছু ড্রেজার মেশিন ও পাইপ ধ্বংস করা হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ কর্মকা-।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শেষ হলেই আবার নতুন করে শুরু হয় মাটি কাটার মহোৎসব। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী এলাকার কিছু সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, অবৈধভাবে মাটি কাটার কারণে তাদের জমিতে ফসল ফলানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক জমি চাষের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আশপাশের বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য ফসলি জমি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বায়নগর গ্রামের হেলাল মুন্সি বলেন, মাটি ব্যবসায়ী ও ড্রেজার মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে আমরা সাধারণ জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত। আমার জমির পাশের জমিতে ড্রেজার দিয়ে মাটি উত্তোলনের কারণে আমার জমির অনেকাংশই ভেঙে গেছে। আমার মতো এমন অনেক জমির মালিক রয়েছেন যারা নিরুপায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মালিগাঁও এলাকার ড্রেজার দিয়ে তোলা বালু ব্যবসায়ী জানান, আগে আওয়ামী লীগের লোকজনের সঙ্গে মিলে করেছি আর এখন বিএনপির লোকজনের সঙ্গে মিলে করতে হচ্ছে। ড্রেজার ভাড়া, বিভিন্ন অফিস, মিডিয়া ম্যানেজ করে এখন আর পোষায় না। আর মানুষের গালি শুনতে চাই না, এ ব্যবসা ছেড়ে দেব।

একই অবস্থা তিতাস উপজেলার দক্ষিণ মাছিমপুর গ্রামে। ওই গ্রামের বাসিন্দারা অবৈধ ড্রেজার বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। 

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তিতাস উপজেলার মাহিসপুর মৌজার মাছিমপুর বিল সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন অবৈধভাবে ড্রেজার ব্যবহার করে মাটি ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে আশপাশের আবাদি ও ফসলি জমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। বালু উত্তোলনের ফলে জমির মাটি সরে গিয়ে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক জায়গায় ফসলি জমির আইল ও জমির সীমানা নষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ বিঘারও বেশি ফসলি জমি ও সরকারি খাস জমি কেটে মাটি/বালু উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে বারবার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানানো হলেও ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ফলে দিন দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে।

এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদ আহমেদ বলেন, আমি নিজেই অবৈধ মাটিকাটা ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযান করতে গিয়ে যে সমস্যায় পড়েছি, সেটা হলো ড্রেজার মেশিনগুলো দুর্গম এলাকায়, যেখানে কাদামাটি এবং প্রায় দেড়/দুই কিলোমিটার হাঁটতে হয়। পরে এগুলো বন্ধের বিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপরও বন্ধ না হলে মামলা করে দেব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত