পটুয়াখালীর কুয়াকাটার গঙ্গামতি ধোলাই মার্কেট এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের স্লোপ দখল করে আবারও স্থাপনা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থাপনা করতে গিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে বন বিভাগের গাছপালা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় বন বিভাগের লোকজন দায়িত্ব পালন করায় গভীর রাতে ঘরগুলো তোলা হচ্ছে। গত এক মাসে সেখানে অন্তত ১২টি নতুন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এখনো চলছে নতুন করে দোকানঘর নির্মাণ।
সরেজমিন দেখা যায়, কুয়াকাটা সৈকতের মিরাবাড়ী থেকে ঝাউবাগান পর্যন্ত বেড়িবাঁধের রিভার সাইডে ছোট-বড় অসংখ্য স্থাপনা। সেখান থেকে গঙ্গামতি সেতু হয়ে ধোলাই মার্কেট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নতুন স্থাপনাও করা হয়েছে। ধোলাই মার্কেটের দুই পাশে বাঁধের স্লোপ দখল করে চলছে স্থাপনা নির্মাণের কাজ। কোথাও কোথাও বন বিভাগের লাগানো গাছপালা কেটে জায়গা পরিষ্কার করে সেখানেই দোকানঘর তোলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জমিতে এভাবে স্থাপনা নির্মাণ চললেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ করা হচ্ছে না। ফলে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে সংস্কার করা বেড়িবাঁধের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিও বাড়ছে। এর আগে শুধু বেড়িবাঁধের স্লোপ দখল করে গড়ে ওঠা ৬৭৩টি স্থাপনা অপসারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল ৭ কোটি ৩১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৭ টাকা।
কুয়াকাটা-গঙ্গামতি পর্যটন এলাকার স্বার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪৮ নম্বর পোল্ডারের ৩৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুনরাকৃতিকরণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং সাগরের ভাঙন থেকে রক্ষায় ২০১৯ সালে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯ কিলোমিটার বাঁধের মেরামত, পুনরাকৃতিকরণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়। সাগরের ভাঙন ঠেকাতে সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কংক্রিটের ব্লক স্থাপন করা হয়। তৈরি করা হয় বাঁধের রিভার ও কান্ট্রি সাইডে বনায়ন এবং ঘাসের আবরণ। একই সঙ্গে বাঁধ রক্ষায় ৯টি স্লুইসগেট মেরামত ও সংস্কার করা হয়। কুয়াকাটা পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি লতাচাপলী, কুয়াকাটা পৌরসভা ও ধুলাসার ইউনিয়নের একাংশের মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বাঁধটি আবারও দখলের কবলে পড়েছে।
বনবিভাগের গঙ্গামতি বিট কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা সবসময় ওখানে দায়িত্ব পালন করি। তবে রাতের আঁধারে সেখানে ঘর তৈরি করা হয়। আমরা নিষেধ করলেও তারা কর্ণপাত করে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দিনের বেলায় বন বিভাগের লোকজন সেখানে থাকেন। তাই গভীর রাতে ঘরগুলো তোলা হয়। অনেক দোকান টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে কথা বললে এলাকায় থাকা যাবে না।’
ধোলাই মার্কেটে দোকান নেওয়া ব্যবসায়ী ইব্রাহিম বলেন, ‘সরকারি খাস জমিতে রাস্তার পাশে রাকিব নামে একজন দোকান তৈরি করে দিয়েছেন। একসময় সরকার রাকিবের বাবাকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে এখান থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। এখন আবার দোকান তুলে আমাকে দিয়েছে। কীভাবে দিয়েছে, কেন দিয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তার কাছে জিজ্ঞেস করেন।’
জানতে চাইলে রাকিব বলেন, ‘বাবার দোকান ছিল সেখানে। পরে আমি দোকান তৈরি করেছি। কোনো টাকার বিনিময়ে দোকান বিক্রি করিনি। একটি দোকানের জন্য প্রতি মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া নেই। আরেকটি দোকানে আমি নিজেই ব্যবসা করি। শুধু আমি নই, আশপাশে অনেকেই দোকান তুলছে। মার্কেটের সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দোকান তৈরি করা হয়।’
বেড়িবাঁধের ওপর বন বিভাগের গাছপালার মধ্যে দোকান নির্মাণ করা ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘এই জমি ছিল আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। পানি উন্নয়ন বোর্ড রাস্তা করার জন্য জমি নিয়েছে। এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড চাইলে আমরা দিয়ে দেব। আশপাশের লোকজন দোকান তুলে অনেকেই দখল করেছে, তাই আমিও দোকান তুলেছি।’
স্থানীয়রা বলছেন, সরকারি অর্থে পুনর্নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা বেড়িবাঁধে নতুন করে দখল বন্ধে দ্রুত অভিযান চালানো দরকার। বাঁধের স্লোপে বন বিভাগের গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে দখল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ধোলাই মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. বাদল সরদার বলেন, ‘এখানে আগে যাদের দোকান ছিল তারা দোকান তৈরি করছে। তবে আমরা কাউকে অনুমতি কিংবা সহযোগিতা করছি না। আমাদের না জানিয়েই তারা ঘর তুলছে।’
পাানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ‘কুয়াকাটা সৈকতের পাশে যেসব স্থাপনা তোলা হয়েছে, সেগুলো অপসারণে মাইকিং করা হয়েছে। ধোলাই মার্কেটের স্থাপনাগুলো অপসারণে নোটিস পাঠানো হয়েছে।
কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য ও কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, ‘এসব স্থাপনা অপসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’