জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে তিনি রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সোয়া ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের নতুন আহ্বান’। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল বহন করা আর সম্ভব নয়। সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইনে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে বিশ্বনেতাদের অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী আয়োজনের জন্য গাম্বিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সহযোগী দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বহু দশক ধরে মিয়মানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। ১৯৭৮ ও ১৯৮০-এর দশকে আসা রোহিঙ্গাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের চরম সহিংসতার পর পরিস্থিতি ইতিহাসের জটিলতম রূপ নেয়।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিগত নয় বছর ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন মানবিক এই বোঝা আরও ভারী হচ্ছে। শরণার্থী শিবিরে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করায় অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন এক প্রজন্ম গড়ে উঠছে। বাংলাদেশ তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই শিবিরগুলো বাসযোগ্য পরিবেশ নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বাস্তুচ্যুতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চরম ক্ষতি হচ্ছে। বাড়ছে মানবপাচার, মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। এ পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
অপরদিকে মানবিক সহায়তার তহবিল আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ২০২৫ সালে ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২০২৬ সালে তা কমে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করেন, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার এই উদারতা কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না।সংকট নিরসনে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৫ দফা জরুরি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন:
১. রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করা।
২. মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. রোহিঙ্গা ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও স্থায়ী মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৪. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৫. মাদক, মানবপাচার ও আঞ্চলিক অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে জানান, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকুক। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির সাথে এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের জীবনের গল্প যেন আর নিপীড়নের না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার আলো হয়ে ওঠে—এবং সেই প্রক্রিয়ার সূচনা এখনই হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের বৈঠক
নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বারহাম সালিহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক