একসময় রাস্তায় বের হলেই কুড়াতে হতো গালমন্দ, গা লক্ষ্য করে উড়ে আসত ঢিল কিংবা কাচের বোতল। তালিবানদের কড়া নিষেধাজ্ঞার মুখে সাইকেল চালানো তো দূরের কথা, কোনো নারী একা বের হওয়াই যেখানে অসম্ভব, সেখানে স্বপ্নকে বুকচাপা দিয়ে বাঁচতে চাননি ফারিবাহ হাশিমি। মুখে দুটি-তিনটি মাস্ক, চোখে চশমা, মাথা ঢাকা স্কার্ফ আর পরনে পুরুষের ঢিলেঢালা পোশাক—এভাবেই দিনের পর দিন ছদ্মবেশ ধরে সাইকেলের পেডেলে প্যাডেল চালিয়ে গেছেন আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় ফারিয়াব প্রদেশের এই তরুণী।
সেই ছদ্মবেশী আফগান সাইক্লিস্ট ফারিবাহ এখন ইতিহাসের পাতায়! মঙ্গলবার জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ এশিয়ান গেমসের নারী রোড রেসে রুপার পদক জিতেছেন ২৩ বছর বয়সী এই অদম্য অ্যাথলেট। ২০০২ সালের পর এই প্রথম কোনো আফগান নারী এশিয়ান গেমসের পদকমঞ্চে দাঁড়ানোর গৌরব অর্জন করলেন।
গল্পের শুরুটা ছিল ২০১৭ সালে। ফারিবাহ ও তাঁর বোন ইউলদুজ হাশিমি কারো কাছ থেকে সাইকেল ধার নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন স্থানীয় একটি প্রতিযোগিতায়। সেখান থেকেই সাইক্লিংয়ের প্রতি প্রেম। কিন্তু আফগানিস্তানের রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের সাইকেল চালানো ছিল চরম অপরাধের মতো। বাবার দুশ্চিন্তা আর চারপাশের মানুষের তীব্র আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে তিনি পথ বেছে নেন—লুকিয়ে ট্রেনিং করার। কিন্তু ২০২১ সালে তালিবানরা পুনরায় ক্ষমতার দখল নিলে খেলাধুলা ও সাধারণ জীবনে আফগান নারীদের ওপর নেমে আসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে জন্মভূমি ছেড়ে পালানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না দুই বোনের। ইতালির সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সাইক্লিস্ট আলেসান্দ্রা কাপেলোত্তোর সহায়তায় ও ইতালি সরকারের আয়োজনে বিমানে চেপে দেশ ছাড়েন তারা। ইতালির ভেনেতো অঞ্চলে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়ার পর শুরু হয় একেবারে নতুন এক লড়াই। সেখানকার শিশুদের মতো বেসিক সাইক্লিং কোর্স থেকে শুরু করে ডলোমাইটসের দুর্গম পাহাড়ে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ পথ পরিক্রমা।
নিজের দেশে প্রতিযোগিতা করা অসম্ভব বলে ২০২২ সালে সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত আফগান জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন ফারিবাহ। পরবর্তীতে ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকেও আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
এবারের এশিয়ান গেমসে ৯০.৪ কিলোমিটার রোড রেস সম্পন্ন করতে ফারিবাহ সময় নেন ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ৫ সেকেন্ড। রোমাঞ্চকর ফিনিশিংয়ে চীনের লি গু সোনা এবং হংকংয়ের লিউং উইং ই ব্রোঞ্জ জেতেন। এই প্রতিযোগিতায় কোনো মেকানিক বা সাহায্যকারী দল সাথে ছিল না ফারিবাহর। নিজের সাইকেল নিজেকেই ধুতে হয়েছে, মেরামতও করতে হয়েছে নিজের হাতেই।
ইতালিতে অনুশীলন চালিয়ে গেলেও ফারিবাহর চোখ এখন ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের দিকে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটাই—একদিন নিজের মুক্ত স্বদেশে ফিরে গিয়ে নিজ দেশের মেয়েদের অনুপ্রেরণা জোগানো।
হাসান-খালেদের ৪২ উইকেট; কাউন্টির শীর্ষ স্তরে ফিরলো কেন্ট