বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে এক মাসের মধ্যে স্কিম ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল আমানতের সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এর বেশি আমানত থাকলে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না। নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অংশের টাকা কেটে বাকি অর্থ ফেরত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত স্কিম ঘোষণা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আমানতকারীর আমানত ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে পুরো মূল আমানত ফেরত দেওয়া হবে। তবে ৫০ লাখ টাকার বেশি আমানত থাকলে নির্দিষ্ট হারে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারী। ১ কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতের ক্ষেত্রে প্রথম ১ কোটি টাকার জন্য ফেরত দেওয়া হবে ৮০ লাখ টাকা। এর অতিরিক্ত অংশের ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, কারও আমানত ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হলে প্রথম ১ কোটি টাকার বিপরীতে ৮০ লাখ টাকা এবং অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকার ৫০ শতাংশ হিসেবে ১০ লাখ টাকা ফেরত পাবেন। সব মিলিয়ে ওই আমানতকারী ৯০ লাখ টাকা ফেরত পাবেন। দেড় কোটি থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতের ক্ষেত্রে প্রথম দেড় কোটি টাকার জন্য ফেরত দেওয়া হবে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর অতিরিক্ত অংশের ৪০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে। আর ২ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানতের ক্ষেত্রে প্রথম ২ কোটি টাকার জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এর অতিরিক্ত অংশের ৩০ শতাংশ ফেরত পাবেন আমানতকারী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা জানান, চারটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের হিসাব নির্ধারণের পাশাপাশি আমানতকারীদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এসব হিসাবের ভিত্তিতে অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আমানতের পরিমাণ ৫ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে রয়েছে ৩ হাজার ১২ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্সে ১ হাজার ২৪৬ কোটি এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৪৪৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চার প্রতিষ্ঠানে আমানতের পরিমাণ ১২ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থাও নাজুক। চার প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্যসংকটের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বর্তমানে প্রশাসকেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায় ও আমানতের তথ্য যাচাই করছেন। আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পর অন্যান্য শ্রেণির আমানতকারী ও পাওনাদারদের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কত টাকা কত সময়ে ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও আদায়যোগ্য অর্থের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণা, প্রশাসক নিয়োগ