কয়লায় চীনের ‘না’

ঝুলছে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০১ এএম

পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটে চীনা বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের নয়া নীতির পাশাপাশি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় এই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এই ইউনিট নির্মাণের জন্য বর্তমান সরকার আগ্রহী হলেও চীনা এক্সিম ব্যাংকের দেড় বিলিয়ন ডলারের ঋণের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় এই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সংকট কাটাতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গত ১৩ সেপ্টেম্বর চীনা একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত সোমবার আশিক চৌধুরীর বক্তব্য জানার জন্য তার জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু হানিফ সাগরের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলে আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকায় এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানিয়েছেন।

পায়রাতে একটি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এখানে একই ক্ষমতার আরও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এজন্য জমি অধিগ্রহণ, উন্নয়নসহ আরও কিছু কাজ করে রাখা হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রটির দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করার পাশাপাশি চীনা এক্সিম ব্যাংক (সি এক্সিম ব্যাংক) থেকে ঋণ অনুমোদনের চূড়ান্ত আলোচনাও চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলে প্রকল্পটির কাজ আর এগোয়নি। যেখানে যে অবস্থায় ছিল, সেখানে সেই অবস্থায় রয়ে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অরাজনৈতিক সরকারের অধীনে চীনের সরকারি কোম্পানিগুলো কোনো বিনিয়োগ না করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে অন্য কোনো দেশের বিনিয়োগের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমেই চীন সফরে যান। চীনের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের পর বড় বিনিয়োগকারী বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চীনকে পাশে পেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী চীনা প্রকল্পগুলো ফের এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডকে (বিসিপিসিএল) পায়রা দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের তরফ থেকে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে পায়রা থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের বিষয়টিও এই প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অন্যদিকে দেশে তীব্র জ¦ালানি সংকট শুরু হলে সরকার জ¦ালানি বহুমুখীকরণে আগের সরকারের নীতি অনুসরণের দিকে ঝোঁকে। এজন্য মাতারবাড়ী এবং পায়রাতে আগের সরকারের নেওয়া দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি কয়লাচালিত বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে গ্যাসের ওপর চাপ কমবে। বেঁচে যাওয়া গ্যাস চাইলে কারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর ফলে দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

সরকার চাইলেও এখন চীনা নীতিই বড় বাধা : কভিড-১৯-এর সময় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিং থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে জাতিসংঘের (ইউএন) ৭৬তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে অংশ নেন এবং ‘আত্মবিশ্বাস জোরদার করা এবং যৌথভাবে সংকট মোকাবিলা করে আরও সুন্দর একটি বিশ্ব গড়ে তোলা’ শিরোনামে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে ২০৩০ সালের আগে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার এবং ২০৬০ সালের আগে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করার কথা বলেন। তিনি ঘোষণা করেন, চীন অন্য উন্নয়নশীল দেশকে সবুজ ও নিম্ন-কার্বন জ¦ালানি উন্নয়নে সহায়তা বাড়াবে এবং বিদেশে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করবে না।

প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্যের পর চীন বিদেশে নতুন কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে চীনের কোনো কোম্পানি দেশের বাইরে কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবেও দরপত্র জমা দিচ্ছে না।

বিসিপিসিএলের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে সি এক্সিম ব্যাংকে ঋণ নিয়ে আলোচনার সময় প্রকল্পটিকে নতুন না দেখিয়ে চলমান বা অনগোয়িং প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এতে এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পটিতে ঋণ দিতে সম্মত হয়। কিন্তু পরে সরকার পরিবর্তনের পর আর নতুন কোনো আলোচনা কোনো পক্ষ থেকে করা হয়নি। সূত্রটির মতে, সেই আলোচনার তিন বছর পর এসে সি এক্সিম ব্যাংকের কাছে পুনরায় ঋণ চাইতে গেলে প্রকল্পটিকে চলমান দেখানো কঠিন। এজন্য বিষয়টির উচ্চপর্যায়ে একটি সমাধান প্রয়োজন হবে। দুই দেশের প্রধানদের ঐকমত্য ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যে ঋণ এর আগে দেওয়ার বিষয়ে সি এক্সিম ব্যাংক সম্মত হয়েছিল, এখন তা অনেক দূরে সরে এসেছে।

বিদ্যুতে বিনিয়োগে অনাস্থা তৈরি হয়েছে : বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ আইন ২০১০-এর আওতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের ক্রয় চুক্তি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও ক্রয় চুক্তিগুলো সংশোধনের ধারা অব্যাহত রেখেছে। এদিকে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিলও আটকা পড়ছে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে।

সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে স্বীকার করেন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

বিসিপিসিএলের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছয় বছর চলার পর সাত বছরে এসে ১ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতায় চলা কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি টেস্টে ১ হাজার ৮৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পরে আপত্তি জানালে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট করা হয়। কিন্তু গত গ্রীষ্মেও কেন্দ্রটি ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। পিপিএতে এ ধরনের সংশোধনী না থাকায় আপত্তি জানিয়ে রেখেছে বিসিপিসিএল।

বিসিপিসিএলের বক্তব্য : জানতে চাইলে বিসিপিসিএলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. মাসুদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীন থেকে একটি প্রতিনিধি দল সরাসরি এসে বৈঠক করে গেছে। তারা আমাদের কিছু জানিয়ে যাননি। চীন বাইরে বিনিয়োগ করবে না, এমন ঘোষণা থাকলেও এই প্রকল্পটির কাজ যেহেতু আগে শুরু হয়েছে তাই তারা এখানে বিশেষ ছাড়ও দিতে পারে। তিনি জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা ছিল। তবে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত