গণশুনানিতে উপচে পড়া ভিড়, মানবিক প্রশাসনের দৃষ্টান্ত ডিসি জাহিদের

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ পিএম

বাবার হাতে মেয়ের চিকিৎসার কাগজপত্র। মেয়ের হাতে ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের পরীক্ষার প্রতিবেদন। কেউ এসেছেন অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে। আবার কেউ চাকরি হারানোর পর ঋণের বোঝা নিয়ে ছুটে এসেছেন প্রশাসনের দ্বারে। আর প্রবাসে থাকা কেউ হাজার মাইল দূরে বসেও অনলাইনে জানিয়েছেন দেশে থাকা জমি, বাড়ি ও সম্পত্তি নিয়ে উদ্বেগের কথা।

মানুষ আলাদা, সংকটও ভিন্ন। তবে বুধবার তাদের সবার গন্তব্য ছিল এক—চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানি।

বেলা ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষ সেবাপ্রত্যাশীদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে। সামনে বসে একে একে মানুষের কথা শুনছিলেন জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কেউ তার হাতে তুলে দেন চিকিৎসার ফাইল, কেউ জমির দলিল। কেউ জানান অসুস্থতার কথা, কেউ তুলে ধরেন সংসারের টানাপোড়েন।

জেলা প্রশাসক তাদের কথা শোনেন, কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। চিকিৎসা ও জীবিকার সংকটে থাকা মানুষকে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা। জমি ও সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিন সরাসরি গণশুনানিতে অংশ নেন দুই শতাধিক মানুষ। এর বাইরে নেদারল্যান্ডস, ওমান, দুবাই ও কুয়েত থেকে অনলাইনে যুক্ত হন আরও চার প্রবাসী।

পূর্ব বাকলিয়া থেকে আসা এক বাবার দুশ্চিন্তার কারণ অসুস্থ মেয়ে। তার আয় সামান্য। স্ত্রীও সন্তান প্রসবের পর থেকে অসুস্থ। একদিকে স্ত্রীর চিকিৎসা, অন্যদিকে মেয়ের চিকিৎসার খরচ—দুইয়ের ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটির সামর্থ্য প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তারপরও মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ করতে চান না তিনি। তাই চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে আসেন। তাঁর কথা শুনে কাগজপত্র পর্যালোচনা শেষে মেয়ের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

আব্দুল্লাহ আল মামুনের আবেদনপত্রে লেখা একটি বাক্যেই যেন ফুটে উঠেছে তাঁর সংকটের চিত্র—‘ঋণগ্রস্ত থেকে বাঁচিয়ে, আমি এবং আমার পরিবারকে টিকে রাখুন।’

২০২২ সালে চাকরি হারানোর পর থেকেই আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণ করতে হয়েছে। পরিবারের একজনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামে (ইউএসটিসি) পড়াশোনার খরচও রয়েছে। সীমিত আয়ের বিপরীতে সংসারের ব্যয় ও ঋণের কিস্তি চলতে থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। গণশুনানিতে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরলে তাঁর আবেদন বিবেচনায় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

অমলা দাস এসেছিলেন নিজের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। সঙ্গে ছিল চিকিৎসার কাগজপত্র। তার আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনে লিভার বড় হয়ে যাওয়া, গ্রেড-২ ফ্যাটি লিভার ও সিস্টাইটিসের কথা উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়মিত ওষুধের ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর কথাও শুনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

হাটহাজারী থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বহন করতে গিয়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েছেন। স্ত্রীর চিকিৎসা চালিয়ে নিতে তিনি আড়াই লাখ টাকা সহায়তা চেয়েছিলেন। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে তার আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে আসে। গণশুনানিতে তাঁর কথা শুনে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

মানসী দত্ত এসেছিলেন ক্যানসারে আক্রান্ত মা লক্ষ্মী দত্তের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামের হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনে লক্ষ্মী দত্তের বাম টনসিলের বায়োপসিতে ‘লিম্ফোপ্রোলিফারেটিভ ডিজঅর্ডার, ফেভারস নন-হজকিন লিম্ফোমা’ উল্লেখ রয়েছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও তাঁর চিকিৎসা হয়েছে বলে আবেদনে জানানো হয়।

মায়ের চিকিৎসা যেন অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়—এই আবেদন নিয়ে আসা মানসীর কথাও শুনেছেন জেলা প্রশাসক। পরে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

রাউজান থেকে আসা আরেক ব্যক্তি দীর্ঘদিনের অসুস্থতার চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে তার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে তার আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে আসে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গণশুনানিতে উপস্থিত হলে তাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

প্রবাসীদের অভিযোগও শুনলেন ডিসি

সম্মেলনকক্ষে একের পর এক মানুষ যখন তাদের সমস্যার কথা বলছিলেন, তখন পর্দায় যুক্ত হন বিদেশে থাকা চট্টগ্রামের চার বাসিন্দা। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাদের উদ্বেগ পড়ে আছে দেশে থাকা জমি, বাড়ি ও সম্পত্তি নিয়ে।

নেদারল্যান্ডসপ্রবাসী হাটহাজারীর নাছের ইসলামের অভিযোগ, তার মা ছকিনা খাতুনের কাছ থেকে হেবা সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বিপরীতে মোহাম্মদ ইব্রাহীম অবৈধভাবে নামজারি খতিয়ান সৃষ্টি করেছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি), হাটহাজারীর কাছে আবেদন করেও দীর্ঘদিন সমাধান না পাওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চান।

ওমানপ্রবাসী মিরসরাইয়ের মো. মোস্তফার অভিযোগ, প্রতিবেশী জাফর উল্লাহ ও তার সহযোগীরা তার কেনা সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন। পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। স্থানীয়ভাবে বৈঠক করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান মোস্তফা।

দুবাইপ্রবাসী ফটিকছড়ির মামুনুল হকের অভিযোগ, তার মালিকানাধীন জায়গা তার ভাতিজা মাসুদ জোর করে দখল করে ভাড়া দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মামুনুল হক জানান, এর আগে উপজেলা প্রশাসনের তদন্তের পর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শে আদালতে মামলা ও থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। এরপরও বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানান তিনি।

কুয়েতপ্রবাসী হাটহাজারীর মো. ফোরকানের দুশ্চিন্তা তার কেনা একটি ভবন নিয়ে। ভবনটি দেখাশোনার জন্য বোন শিরু আক্তার ও রাসু আক্তারকে সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, শিরু আক্তার, মো. রশেদ, রোকসানা ও রাসু এখন ভবনটি দখলের চেষ্টা করছেন। তাঁর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকেও সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রবাসীদের চারটি অভিযোগই শুনেছেন জেলা প্রশাসক। পরে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়গুলো তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তার অগ্রগতি ও ফলাফল যেন অভিযোগকারীরা জানতে পারেন, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

২২ জনকে আর্থিক সহায়তা

গণশুনানি শেষে এদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ ও অসহায় ২২ ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও জীবিকায়নের জন্য জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এ ছাড়া রোবোটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাওয়া এক মেধাবী শিক্ষার্থীকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পন্সরশিপ দেওয়া হয়।

প্রশাসনের কাছে প্রতিদিন অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে। সঙ্গে থাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, সুপারিশপত্র, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র, আলট্রাসনোগ্রাম, হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদন কিংবা জমির দলিল। কাগজে সেগুলো একেকটি আবেদন বা ফাইল হলেও, এসব ফাইলের পেছনে থাকে মানুষের ব্যক্তিগত সংকট ও প্রত্যাশা।

বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে সেই মানুষগুলোর কথাই সরাসরি শোনা গেছে। একজন বাবা মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সহায়তা চেয়েছেন, একজন মেয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে সহায়তা চেয়েছেন। একজন স্বামী স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন। চাকরি হারিয়ে ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত একজন মানুষও জানিয়েছেন তার সংকটের কথা। আর চার প্রবাসী দূরদেশে বসে জানিয়েছেন দেশে থাকা জমি ও বাড়ি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা।

জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা তাদের কথা শুনে যেখানে সম্ভব তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়েছেন। আর যেখানে তদন্তের প্রয়োজন, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন।

এক দিনের আর্থিক সহায়তায় ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হবে না, দীর্ঘদিনের ঋণও মিটবে না। একইভাবে বছরের পর বছর চলা জমি-সম্পত্তির বিরোধেরও এক দিনে নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। তবে সংকটের সময়ে প্রশাসনের কাছে নিজের কথা সরাসরি বলার সুযোগ পেয়েছেন মানুষগুলো। কেউ পেয়েছেন তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা, কেউ পেয়েছেন অভিযোগ তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা।

গণশুনানির মানবিকতার জায়গাটি হয়তো এখানেই—কাগজে থাকা আবেদন নয়, সেই আবেদনের পেছনে থাকা মানুষটির কথাও গুরুত্ব দিয়ে শোনা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত