যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে ইরানের অর্থনীতি। উপসাগরীয় অঞ্চলে গত ৭ মাস ধরে চলা সংঘাত তেহরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করেছে। যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের তেল রপ্তানি যেমন কমেছে, তেমনি মুদ্রার রেকর্ড দরপতন, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন। শান্তি আলোচনা স্থবির হওয়ার পাশাপাশি কঠোর নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশটির অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে। বার্তাসংস্থা এপি জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার ইরানি রিয়ালের দামে রেকর্ড দরপতন ঘটেছে। তেহরানের মুদ্রাবাজারে এখন এক ডলারের বিনিময়ে ২৫ লাখের বেশি রিয়াল দিতে হচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে খোলা বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল প্রায় ১৭ লাখ রিয়াল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটির মুদ্রার মান বারবার নতুন করে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামছে। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর রিয়ালের মান কমে প্রতি ডলারে ২২ লাখ রিয়ালের রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
দেশটির গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইরানের খোলা বাজারে ১ ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮ লাখ রিয়াল। ছয় মাস পর ওই বছর ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ লাখ ২০ হাজার রিয়ালে। এতে আরও বলা হয়, বিনিময় হার এখন ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের একটি স্পষ্ট সূচক হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক অচলাবস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে ইরানের রিয়াল। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, প্রতি সপ্তাহেই বাজারে পণ্যের দাম বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর গত ছয় মাসে পণ্যের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৫ গুণ। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। আরেক ব্যক্তি বলেন, মুদ্রাস্ফীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে একজনের আয়ে কোনো পরিবারের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। বাজারে সব কিছুই পাওয়া যায়, কিন্তু তা কেনার সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নেই। ১০ দিন আগের তুলনায় এখন প্রতি কেজি চিনির দাম ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার রিয়াল বেশি।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ইরানে মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৬১.৪ শতাংশে। আগের বছরের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১২৮ শতাংশ পর্যন্ত। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে মুদ্রার দরপতনের পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা। যার ফলে দেশটির মুদ্রাবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। এই ধারাবাহিক দরপতনের জন্য দুটি প্রধান সমস্যার কথা তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি। একটি হলো দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি, নানা সমস্যা জর্জরিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আর্থিক ঘাটতি মেটাতে সরকারের অর্থ ছাপানোর প্রবণতা। অপরটি হলো বহিরাগত ধাক্কা। এর মধ্যে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, বারবার রাজনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধের অব্যাহত আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধ তেলসমৃদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার গোটা অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে খাদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ওষুধ পাচ্ছে না ইরানিরা
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ওষুধ শিল্প মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর জেরে দেশটিতে ওষুধের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং কিছু চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠায় রোগী ও তাদের পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছেন। যুদ্ধের প্রভাবে কোনো কোনো ওষুধের দাম তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। আমদানিনির্ভরতার কারণে ইরানের ওষুধ শিল্প অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখন পর্যন্ত ইরানের হাসপাতালগুলোতে বড় ধরনের ওষুধ সংকটের বড় কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও, সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে এর সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান তার চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ দেশেই উৎপাদন করে, তবে এর অনেকগুলোর জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করতে হয়। তেহরান ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য বাহমান সাবুর স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, যুদ্ধের আগে বেশিরভাগ ওষুধ ও ঔষধি উপাদান সমুদ্রপথে আনা হতো, তবে নৌ-অবরোধের কারণে তা স্থগিত রয়েছে। মেডিকেল আমদানিকারকরা অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল আকাশপথে রুট পরিবর্তন করলেও, ইরানের বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনসের ওপর ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা সেখানেও হুমকি সৃষ্টি করেছে।