সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া শিল্পী মূল্যহীন...

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ এএম

মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা রুপালি পর্দা বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পের প্রতিটি আঙিনায় প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিজের মেধা ও স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তারিক আনাম খান। ভারতের প্রখ্যাত ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে নাট্যকলায় উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই শিল্পী দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক। দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

প্রশ্ন : মঞ্চের শুরুটা নিয়ে যদি একটু বলেন তারিক ভাই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখন আপনারা মঞ্চনাটক শুরু করলেন আর এই যে এতদিন ধরে করছেন, সেই শুরুর সময়ের স্পিরিট বা অনুভূতিগুলো কি এখনো আগের মতোই লাগে, নাকি কোনো বদল চোখে পড়ে?

তারিক আনাম খান : থিয়েটার মাধ্যম হিসেবে এখনো একই রকম শক্তিশালী আছে। এখনো আমি পড়ি, জানার চেষ্টা করি। সেটা অ্যাক্টিংয়ের নিউ ট্রেন্ড হোক কিংবা থিয়েটারের অন্য জায়গায় কী হচ্ছে না হচ্ছে। সেই আগ্রহ এখনো আছে এবং একেবারে আগের মতোই আছে। আমি নিজেও কিছু কাজ করি, ওয়ার্কশপ, ক্লাস, মাঝে অ্যাডাপটেশনও করেছি। ভবিষ্যতে এগুলো মঞ্চে আসবে। অনেক পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু মাঝে মধ্যে অনেকে পিছিয়ে যায়। সেটার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

তবে যে স্পিরিট নিয়ে দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চা, সিরিয়াস থিয়েটার নিয়ে ভাবনা এবং স্বল্প পরিসরে বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট আমরা দেখেছি, সেটা সামগ্রিকভাবে যেন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। এটা খুব স্বাভাবিক, কারণ পঞ্চাশ বছর আগের বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো থিয়েটারটাকে আমরা পুরোপুরি প্রফেশনাল রূপ দিতে পারিনি। এটা আমাদের এক ধরনের ব্যর্থতা, সামগ্রিক ব্যর্থতা। সরকারের তরফ থেকেও কেবল একটা অডিটোরিয়াম বা জায়গা করা হলো। আগে আমরা মহিলা সমিতিতে নাটক করতাম, ওটার একটা স্পিরিট ছিল। এখন শিল্পকলা একাডেমির মতো বড় জায়গায় তিনটা মঞ্চ হয়েছে স্টুডিও থিয়েটার, এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার, প্রসেনিয়াম থিয়েটার। কিন্তু আজকে কেউ যদি উত্তরা বা গুলশান-বনানী থেকে উইক ডেতে শিল্পকলায় নাটক দেখতে যায়, সেটা সময় ও সামর্থ্যরে দিক থেকে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এটাকে ছড়িয়ে দিতে পারিনি, এটা আমাদের সামগ্রিক পরাজয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন নাট্যকলা বিভাগ হয়েছে, নাটক শেখানো হচ্ছে, কিন্তু কাজের জায়গা তো তৈরি হচ্ছে না। এটা একটা বড় কষ্টের জায়গা। মনে হয় আরও অনেক কিছু হওয়া উচিত ছিল, যা আমরা পারিনি। তবে এখন অনেক ধরনের কাজ, বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা হচ্ছে এটা একটা ভালো ব্যাপার।

প্রশ্ন : বাইরের দেশে তো মঞ্চে দারুণ সব টেকনোলজি দেখা যায়, আমাদের এখানে বাজেট বা সুযোগ কম বলে কি প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছি? এই ব্যবধানটাকে কীভাবে দেখেন?

তারিক আনাম খান : আমাদের কিন্তু অডিয়েন্স আছে। লন্ডনের কথাই যদি বলি, সেখানে ন্যাশনাল থিয়েটার আছে, রয়্যাল শেক্সপিরিয়ান কোম্পানির নিজস্ব থিয়েটার আছে, ফ্রিঞ্জ থিয়েটার কিংবা বার্বিকান সেন্টার আছে। সেখানে এখনো শেক্সপিয়ার করা হয়, নানা এক্সপেরিমেন্ট হয়। মঞ্চে প্রযুক্তির ব্যবহার দর্শক দেখতে চায়। আমেরিকার ব্রডওয়ে থিয়েটারে আরও বেশি হয়, ওপর থেকে হেলিকপ্টার নামছে দিস ইজ ইল্যুশন, টেকনিক।

তবে টেকনিক কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটাই মূল। আমি টেকনিক দেখাব নাকি নাটকের মূল জায়গাটা তুলে ধরব? লন্ডনের ‘ওয়ার হর্স’ নাটকের কথা ধরা যাক। সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের ঘোড়াগুলো পাপেট আর চমৎকার টেকনিক দিয়ে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছিল যে, দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিল। আবার পশ্চিমবঙ্গে একসময় ‘অঙ্গার’ নাটক হয়েছিল। সেখানে কয়লাবাহী ট্রেন আসছে, আগুন বের হচ্ছে, পানি পড়ছে। প্রযুক্তি সবসময়ই থাকবে। সিনেমাতেও এখন ফিল্মের চাপ নেই, ভিএফএক্স, গ্রিন স্ক্রিন কত প্রযুক্তি এসেছে! কিন্তু সেগুলো আসে জীবনের কথা বলার জন্যই। যা বোঝাতে চাই, তা প্রকাশে টেকনিকের দরকার হয়। টেকনিক মূল নয়; টেকনিক একটা পর্যায়ে গিয়ে যদি নিছক ‘গিমিক’-এ পরিণত হয়, তবে তা শিল্পকে নষ্ট করে।

থিয়েটার সবসময় মানুষের জীবনের কথা, শোষণ-নিপীড়ন আর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ করলে আমরা কেবল বলব না যে মানুষ ভাগ্যের অধীন, মানুষের ভেতরের লড়াই আর নতুন ইন্টারপ্রিটেশন উঠে আসে। আর আমাদের শিল্পকলা একাডেমিতেও এখন এলইডি স্ক্রিন, প্রজেকশন বা লাইটের আধুনিক ব্যবহার হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি তো একাধারে অভিনয়, নির্দেশনা, নাট্যরূপ সবই করছেন। কাজ করার সময় এই আলাদা সত্ত্বাগুলোকে মেলান কীভাবে?

তারিক আনাম খান : থিয়েটার একটি কালেক্টিভ আর্ট ফর্ম। এখানে ভাবনাগুলো প্রাণ পায়। ধরা যাক আমি শেক্সপিয়ারের নাটক করব, সেটা আমি আজকের প্রেক্ষিতে কীভাবে উপস্থাপন করব সেটাই আসল। থিয়েটার অত্যন্ত জীবন্ত একটি মাধ্যম। প্রতিদিনের শোয়ের পর এটি শেষ হয় এবং পরের দিন নতুনভাবে জেগে ওঠে। তাই আমি কোনো নির্দিষ্ট ছকে আটকে যাই না। নাটকের স্পিরিটটা বুঝতে হবে। কমেডি করলে কমেডির হিউমার ও অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ধরতে হবে। সেখানে প্রতিটি চরিত্রের উপস্থিতি, চলাচল ও সংলাপের নিজস্ব জাস্টিফিকেশন থাকে।

আমরা সবসময় নাটকে সমসাময়িক বিষয় যুক্ত করার চেষ্টা করেছি। যেমন যখন ‘বিচ্ছু’ করতাম, তখন কুয়েত-ইরাক যুদ্ধ চলছিল। নাটকে বাবার প্রতি ছেলের ক্ষোভ প্রকাশের একটি সংলাপে পরিস্থিতি অনুযায়ী কুয়েতের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনা হতো, যা মানুষ লুফে নিত। সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতা না দিয়েও যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য বা সমাজের অসঙ্গতি অন্যভাবে নাটকের ভেতর তুলে ধরা যায়। কার্লো গোলদোনির ‘সারভেন্ট অব টু মাস্টার্স’ অবলম্বনে নাটকেও আমরা তৎকালীন সংসদ ও রাজনীতির নানা ঘটনা সংলাপে নিয়ে আসতাম। শিল্পে এই সূক্ষ্ম খোঁচাগুলো মানুষ হাসির মধ্য দিয়ে গ্রহণ করে।

প্রশ্ন : নব্বই সালে যখন ‘নাট্যকেন্দ্র’ করলেন, তখন পেশাদার থিয়েটার গড়ে তোলার ভাবনাটা আসলে কীভাবে কাজ করেছিল?

তারিক আনাম খান : আমাদের স্পিরিটটা সবসময় প্রফেশনাল ছিল। নব্বইয়ের দশকে থিয়েটার পেশাদারভাবে নেওয়া নিয়ে নানা কথা উঠত। কিন্তু আমরা আমাদের পেশাদারিত্বের দায়িত্ববোধ থেকে কখনও বিচ্যুত হইনি। নাট্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল ভাবনাই ছিল থিয়েটার করব। যে নাটকগুলো করতে ভালো লাগে এবং যেভাবে করতে ভালো লাগে, সেভাবেই কাজ করা। সেই সঙ্গে তরুণ ও উদ্যমী অ্যাক্টর তৈরি করা, যারা এখান থেকে অভিনয় নিয়ে ভাববে এবং পরবর্তীতে মিডিয়া বা বড় পরিসরে কাজ করবে।

আমরা বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে গেছি। প্রথমে মলিয়েরের কমেডি ‘বিচ্ছু’ করলাম। কিন্তু কেবল কমেডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিনি। এরপর মুহাম্মদ বিন তুঘলকের জীবনী নিয়ে নাটক করলাম। ইতিহাস তাকে ‘পাগলা রাজা’ বললেও সে নিজের সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। সে রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রার বদলে তাম্রমুদ্রা চালু করল, কাগজের নোটের কথা ভাবল, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংহতি আনতে চাইল যা পরে তার বিরুদ্ধেই গিয়েছিল। সেই ট্র্যাজিক ও ভুল বোঝা চরিত্রকে নিয়ে আমরা কাজ করেছি।

এরপর দুটো নিরীক্ষাধর্মী নাটক করলাম ‘জেরা’ এবং ‘সুখ’। ‘সুখ’ নাটকের থিম ছিল সুখ আসলে কোথায় অর্থ, সম্পদ, আসবাব নাকি অন্য কোথাও? আর ‘জেরা’ নাটকটি করা হয়েছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপটে, যেখানে চারদিকে আত্মসমর্পণ চলছে আর এক সাধারণ মা সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে আছেন। একটা কমেডি সফল হয়েছে বলেই সবসময় মসৃণ পথে কেবল কমেডিই করে যাব, তা ভাবিনি। ১৯৭৯ সালে যখন এনএসডি থেকে পাস করে এলাম, তখন সৈয়দ জামিল আহমেদ, আতাউর রহমান, আলী যাকের, সৈয়দ শামসুল হক, রামেন্দু মজুমদারসহ সবার সঙ্গে বসেছি, চেষ্টা করেছি নাটকে পেশা হিসেবে নেওয়া যায় কিনা তার একটা ক্ষেত্র তৈরি করার।

প্রশ্ন : এনএসডিতে কি শুধুই ওয়েস্টার্ন বা পাশ্চাত্য অভিনয়রীতিই শেখানো হতো, নাকি আমাদের এই অঞ্চলের বিষয়গুলোও থাকত?

তারিক আনাম খান : না, শুধু পাশ্চাত্য নয়। অভিনয়ের বিভিন্ন মেথড ও থিওরি শেখানো হতো। রাশিয়ার কনস্ট্যান্টিন স্তানিসøাভস্কির থিওরি অব অ্যাক্টিং, তার ‘মাই লাইফ ইন আর্ট’, ‘অ্যান অ্যাক্টর প্রিপেয়ার্স’, ‘বিল্ডিং আ ক্যারেক্টার’, ‘ক্রিয়েটিং আ রোল’ বইগুলো ছিল। তার শিষ্য মাইকেল চেখভের তত্ত্ব ছিল, পোল্যান্ডের জের্জি গ্রোটোস্কির কাজ ছিল। একটা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ধারাকে সামনে আনে।

একই সঙ্গে আমরা এই উপমহাদেশের তত্ত্ব নিয়ে পড়েছি। ভারতের ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’র রসতত্ত্ব, ভাব, বিভাব নিয়ে বিষদ কাজ হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ভারতীয় নাট্যকার বাদল সরকার, বিজয় তেন্ডুলকার, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক যেমন হয়েছে, তেমনি আন্তন চেখভ, ইবসেন বা ব্রেখটের নাটকও সমানভাবে চর্চা করা হয়েছে।

প্রশ্ন : একজন অভিনেতার মধ্যে আসল সম্ভাবনা বা জোরটা আপনি কীভাবে বুঝতে পারেন?

তারিক আনাম খান : আমি মূলত দেখি তার কাজের প্রতি স্পিরিট আর চেষ্টাটা কেমন। অভিনয়টা তার অস্থিমজ্জার ভেতরে কতটা দাগ কাটছে। আমি নিজে এনএসডিতে যাওয়ার আগে আকাশবাণী কলকাতায় শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো গুণী অভিনেতাদের রেডিও নাটক শুনে অভিনয়ের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়েছি। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’, ‘ডাকঘর’ বা সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ শুনে যে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেই তাড়নাটা থাকা খুব জরুরি। শুধু চাইলাম আর অমনি হয়ে গেল, তা হয় না। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া উপায় নেই; একাগ্র চেষ্টা থাকলে তবেই চরিত্র আয়ত্ত করা সহজ হয়।

প্রশ্ন : মলিয়েরের ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে যখন ‘কঞ্জুস’ করলেন, পুরান ঢাকার ভাষা আর সেই পরিবেশটা কীভাবে নাটকের ভেতর এলো?

তারিক আনাম খান : শুরুতে এটি সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা কারণে তা এগোয়নি। তখন আমি ‘কঞ্জুস’ নিয়ে ভাবা শুরু করি। নাটকটির মূল বিষয় ছিল পয়সা এবং মানুষের অর্থলিপ্সা। চরিত্রটি এতটাই কৃপণ যে, প্রেম, ভালোবাসা, সন্তান সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার কাছে অর্থ। অর্থই তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

তখন মনে হলো, পুরান ঢাকার একটি ব্যবসায়ী পরিবারের প্রেক্ষাপট নিলে এটি সবচেয়ে ভালো ফুটবে। আমাদের দেশের আঞ্চলিক ভাষা আমাকে সবসময় টানে। পুরান ঢাকার কথ্য বাংলায় যে হিউমার, খোঁচা আর নিজস্ব টান রয়েছে, তা খুব আকর্ষণীয়। তবে তা পুরোপুরি উর্দু নয়, ঢাকাইয়া উর্দু মেশানো বাংলা। এই সংমিশ্রণে নাটকটি নতুন চরিত্র পেল। এমনকি নাটকের দারোগার চরিত্রে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল।

পরে কামালউদ্দীন নীলু এর নির্দেশনা দেন। একজন মানুষ যদি অর্থ নিয়ে অন্ধ থাকে, তবে তার প্রতিটি বিচারবুদ্ধি কীভাবে অর্থের দ্বারা নির্ধারিত হয়, তা কমেডির ছলে তুলে ধরা হয়েছে। কমেডি মানেই হচ্ছে পরিশেষে মিলনাত্মক সমাপ্তি; সেই স্পিরিট রেখেই আমরা নাটকটি তৈরি করেছিলাম।

প্রশ্ন : হলিউডের ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ কিংবা ওপার বাংলায় পরমব্রতর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

তারিক আনাম খান : ‘অ্যাভেঞ্জার্স : এজ অব আলট্রন’-এর চট্টগ্রাম শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের দৃশ্যটির কাজের জন্য হলিউডের একটি দল বাংলাদেশে এসেছিল। তাদের এমন একটি জায়গা দরকার ছিল যেখানে অনেক ভাঙা জাহাজ থাকবে। হলিউডের কাজের ধরন হলো, তারা প্রচুর হোমওয়ার্ক ও রেইকি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা শিপব্রেকিং ইয়ার্ড দেখে নিশ্চিত হয়ে কাজ করতে চেয়েছিল।

আমরা ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে লোকাল প্রোডাকশন সাপোর্ট এবং কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্ব পালন করি। সেখানে কাজের নিরাপত্তা, পরিবেশ, নানা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সব মিলিয়ে দুই মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল। তারা আমাদের পেশাদারত্বে দারুণ খুশি ছিল। এরপর ‘এক্সট্রাকশন’ ছবির শুটিংও এখানে পুরোদমে হওয়ার কথা ছিল। রুসো ব্রাদার্সের টিম ও প্রোডাকশন ডিজাইনার এসে ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকা রেইকি করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনের কারণে সময়মতো শুটিং সম্ভব না হওয়ায় তারা পুরো সেটটি ব্যাংককে তৈরি করে কাজ করে। পরে কেবল তিন দিনের জন্য মূল অভিনেতা ও ইউনিট নিয়ে এসে কিছু প্যাচ-শুট করা হয়।

আমাদের দেশে শুটিংয়ের অসাধারণ সব বৈচিত্র্যময় লোকেশন আছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় মাধ্যম হতে পারে। তবে তার জন্য অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া দরকার, দরকার উদারতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

আমি বেশ কিছু দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি । ‘দ্য লাস্ট ঠাকুর’ তার অন্যতম। অন্যদিকে কলকাতার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘ফেলুদা’র একটি কাজে যুক্ত ছিলাম। তারাও চিত্রনাট্যের প্রতিটি চরিত্র নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত খুঁটিনাটি ভাবনা ও যতœ নিয়ে কাজ করে। এসবই খুব ভালো অভিজ্ঞতা ।

প্রশ্ন :  তারিক ভাই, নাটকে বা সার্বিক শিল্পচর্চায় রাজনীতির ভাবনা আর সামাজিক দায় কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

তারিক আনাম খান : আমি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই, তবে আমি সচেতন এবং অবশ্যই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। স্কুলজীবন থেকেই আমার নাট্যচর্চা শুরু হয়েছিল প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। ১৯৬৯-এ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রামে গণনাট্যের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি, ‘নীলদর্পণ’ পড়েছি, দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে সহযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে নিজেদের লেখা নাটক পরিবেশন করেছি, গণসংগীত দলের সঙ্গে গেয়েছি। যুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক মুক্তির জন্য নয়, আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াইও ছিল।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া একজন শিল্পী মূল্যহীন। ব্রেখটের দর্শন আমাদের সবসময় ভাবায় থিয়েটার কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে সাফাই গাইবে না, বরং দর্শককে ভাবাবে সে সমাজ ও রাজনীতির অংশ। সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তা ছাড়া কোনো শিল্পই মানুষের মনে স্থায়ী হতে পারে না।

প্রশ্ন : এতসব চড়াই-উতরাই আর সমস্যার ভেতরেও ব্যক্তি তারিক আনাম খান মানুষ হিসেবে কতটা আশাবাদী?

তারিক আনাম খান : আমি চূড়ান্ত আশাবাদী একজন মানুষ। সাময়িক নানা জটিলতায় মন খারাপ হলেও পার্থিব চাওয়া-পাওয়া কম বলে মানুষকে নিয়েই ভালো থাকার চেষ্টা করি। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে যখন কোনো মানুষ শহরে এসে টিকে থাকার লড়াই করে, তখন দায়িত্বটা সমাজের সবার।

আমাদের দায়িত্ব হলো দেশ, সমাজ ও এই প্রকৃতিকে সুন্দর রাখা। মানুষ সুন্দর, প্রকৃতি সুন্দর, এই প্রাণিজগৎ সুন্দর। আমরা কেউ একা বাঁচতে পারি না। এই ভালোবাসার বোধ আর ইতিবাচক স্পিরিটটা প্রতিটি মানুষের, বিশেষ করে শিল্পীদের ভেতরে থাকা ভীষণ জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত