বিশ্ব প্রবীণ দিবস

‘সন্তানের অবহেলার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমেই শান্তি’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ এএম

চার মেয়ে ও এক ছেলের বাবা মো. শামসুল হক। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে। কৃষিকাজ করে সংসার চালিয়েছেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলেকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। কিন্তু বয়সের ভারে যখন কাজ করার সক্ষমতা হারালেন, তখনই বদলে যেতে শুরু করল সেই সংসারের চিত্র।

একসময় নিজের ঘর ছেড়ে ভোলা শহরের নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন পরিচালিত বৃদ্ধ নিবাসে আশ্রয় নেন ৮৫ বছর বয়সী শামসুল হক। কেটে গেছে প্রায় দেড় দশক। নিজের নামে থাকা সাড়ে ৩১ শতাংশ জমিও ছেলে-মেয়েদের নামে লিখে দিয়েছেন। সেই জমিতে ছেলে ঘর তুলেছেন। কিন্তু সেই ঘরে ঠাঁই হয়নি বৃদ্ধ বাবার।

বিশ্ব প্রবীণ দিবস উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বৃদ্ধ নিবাসে বসে জীবনের কষ্টের কথা জানান ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শামসুল হক।

শামসুল হক বলেন, ‘জীবনের বেশির ভাগ সময় কৃষিকাজ করে কেটেছে আমার। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। সংসারে অভাব ছিল, তাই সন্তানদের তেমন পড়ালেখা করাতে পারিনি। চার মেয়ের জামাই সবাই দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল।’

তিনি জানান, ২০০৬ সালে ছেলে মফিজুর রহমান বিয়ে করেন। ছেলে বিয়ের পর প্রথম দিকে সংসার স্বাভাবিক থাকলেও বয়সের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ছেলে দিনের বেশির ভাগ সময় ভোলা সদর হাসপাতালের সামনে চা-পানের দোকানে থাকতেন। এ সময় ছেলের স্ত্রীর কাছ থেকে অবহেলা ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শামসুল হক বলেন, ‘ছেলে বাড়িতে না থাকলে ছেলের বউ ঠিকমতো খাবার দিত না। যা দিত, তাতে পেটের খিদা মিটত না। খাবার চাইলে ঝাড়ু নিয়ে মারতে আসত। ছেলে এসব জানলেও তাকে কিছু বলত না।’

এ অবস্থায় ২০১১ সালের দিকে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধ নিবাসে আশ্রয় নেন শামসুল হক। এরপর থেকে এই বৃদ্ধ নিবাসই হয়ে উঠেছে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।

বৃদ্ধ নিবাসে আসার পর নিজের নামে থাকা সাড়ে ৩১ শতাংশ জমি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে লিখে দেন তিনি। তাঁর দেওয়া জমিতে ছেলে নতুন ঘরও তুলেছেন। কিন্তু সেখানে বাবার জন্য জায়গা হয়নি।

স্ত্রী বিলকিস বেগমের কথা বলতে গিয়ে শামসুল হক জানান, বাড়ি ছাড়ার পর স্ত্রী বেশির ভাগ সময় মেয়েদের কাছে থাকতেন। ২০১৭ সালে তিনি মারা যান।

শামসুল হক বলেন, ‘বৃদ্ধ নিবাসে আসার পর প্রথম দিকে ছেলে-মেয়েদের কথা খুব মনে পড়ত। মেয়েরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন খাবার নিয়ে আমাকে দেখতে আসত। কিন্তু ছেলে কোনো কাজ ছাড়া আমাকে দেখতে আসে না।’
তবে দীর্ঘদিন বৃদ্ধ নিবাসে থাকার পর এখন আর বাড়িতে ফিরতে মন চায় না তাঁর। এখানকার মানুষদেরই আপনজন মনে হয়।

তিনি বলেন, ‘এখন এখানেই ভালো লাগে। ১৫ বছর ধরে এখানে আছি। এখানকার সবাই আন্তরিক। সময়মতো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই পাই। বাড়িতে গেলে এখন আর মন টেকে না। বাকি জীবনটা এখানেই কাটাতে চাই।’

সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শামসুল হক বলেন, ‘সন্তানদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। তারা ভালো থাকুক—এটাই কামনা করি।’

শামসুল হকের মতো ওই বৃদ্ধ নিবাসে থাকা আরও কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানা পারিবারিক ও আর্থিক সংকটে পড়ে তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে বৃদ্ধ নিবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। বয়সের শেষ সময়ে তাদেরও ইচ্ছা ছিল সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর। কিন্তু বাস্তবতার কাছে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

দেড় দশক আগে যে বৃদ্ধ নিজের ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বৃদ্ধ নিবাসে, আজ সেই আশ্রয়কেই নিজের আপন ঠিকানা মনে করছেন। সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়া সম্পদ কিংবা পুরোনো সংসারের স্মৃতি নয়—বৃদ্ধ বয়সে একটু নিরাপত্তা, নিয়মিত খাবার আর আপনজনের মতো আচরণই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত