বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা পটুয়াখালীর কুয়াকাটার চরবিজয় দ্বীপে দেখা মিলেছে দৃষ্টিনন্দন নীলাম্বরী পাখি। গতকাল রবিবার দ্বীপটিতে নীল-সবুজ রঙের এই পাখিটির সন্ধান মেলে। স্থানীয় ও পরিবেশবাদীদের মতে, নির্জন এই দ্বীপে নীলাম্বরীর উপস্থিতি চর বিজয়ের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এক নতুন ও ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচন। নীলাম্বরী সাধারণত পানি কিংবা চরে নামে না। তবে এই ছবিতে দেখা যায়, নীলাম্বরী চরে নেমে রোদ পোহাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে দূরের কোনো শিকার। দুপুরের আলোয় তার ছায়া পড়ছে চরের ভেজা বালিতে। নীলাম্বরীর এই অপূর্ব ছবিটি তুলেছেন চর বিজয় দ্বীপে জেলে সাইদুল ইসলাম।
সাইদুল ইসলাম বললেন, ‘চর বিজয়ের বালির ওপরে পাহিডারে (পাখি) দেহি। বৃষ্টিতে পাহিডা একেবারে ভিইজ্জা গ্যাছে। আমি কাছে গেলেও দেহি পাহিডা উড়তে পারে নাই। পাখিডারে গঙ্গামতির বনে যাইয়া রোদে দিয়া শুকাইয়া সুস্থ কইরা ছাইড়া দিছি। এই রকম পাহি আগে কোনোদিন দেহি নাই। এত সুন্দর নীল রোঙের পাহি এই প্রথম দেখলাম। মোবাইলফোনে আমি তার ছবিও তুইলা রাখলাম।’
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘চর বিজয়ে পরিযায়ী পাখির নিয়মিত বিচরণ প্রমাণ করে দ্বীপটি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আবাসস্থল হয়ে উঠছে। নীলাম্বরীর মতো পাখির উপস্থিতি আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষারও একটি বার্তা দেয়। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে পাখি শিকার, ফাঁদ ও জাল পাতা বন্ধের পাশাপাশি পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে বনায়ন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বন বিভাগের ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ : বার্ড’ এর তথ্য অনুযায়ী, নীলাম্বরী বাংলাদেশে একটি সাধারণ ও বিস্তৃত শীতকালীন পরিযায়ী পাখি। শীতকালে এটি একা বা ছোট দলে বিচরণ করে। খোলা বন, বনপ্রান্ত, ঝোপঝাড়, বাগান ও গ্রামীণ গাছপালার এলাকায় এদের দেখা যায়। প্রধান খাবার ছোট ছোট পোকামাকড়। নীলাম্বরীর ইংরেজি নাম Eumyias thalassinus। অম্বর চুটকি কিংবা নীল কটকটিয়া নামেও ডাকে অনেকে। পাখিটির দৈর্ঘ্য সাধারণত ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার।
বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘চর বিজয়ে এর আগে ঝাউ, হেঁতাল, গেওয়া ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। সেখানে নিয়মিত বনায়ন কার্যক্রমও চলছে। প্রায় ২৩০ একর আয়তনের চর বিজয়ে সারা বছরই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ দেখা যায়। শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া থেকে আসা পরিযায়ী পাখির পাশাপাশি গাংচিল, বদর কবুতরসহ বিভিন্ন পাখির দেখা মেলে। সম্প্রতি নতুন করে নীলাম্বরীরও দেখা মিলেছে। এ ছাড়া বক, সাদাবক, গোবক ও চ্যাঁকাসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ প্রজাতির পাখির বিচরণ রয়েছে। চর বিজয়ের চারপাশে পানির গভীরতা কম হওয়ায় এলাকাটি সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও মাছের পোনা বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে গড়ে উঠছে। তবে বন বিভাগের লোকবল কম। নৌপথে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় নৌযান না থাকায় চর বিজয়ে নিয়মিত নজরদারি করাও সম্ভব হচ্ছে না।’
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শীত মৌসুমের শুরুতেই চর বিজয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। পুরো দ্বীপজুড়ে রয়েছে লাল কাঁকড়ার বিচরণ। চর বিজয়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।’