ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো দক্ষিণ চট্টগ্রামেও এখন জমজমাট গ্রামীণ রাজনীতি। নানা কৌশলে এলাকার ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে তৎপর সম্ভাব্য প্রার্থীরা। পাশাপাশি প্রভাবশালী নেতা-এমপিদের সুনজরে আসার চেষ্টায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনয়প্রত্যাশীরা। এদিকে নির্বাচনে দলীয় সমর্থিত প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে উপজেলাভিত্তিক বিশেষ কমিটি গঠন এবং ওই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে।
দক্ষিণ জেলা বিএনপি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে জেলার আটটি উপজেলায় ইউনিয়ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারা, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলী উপজেলায় ছয় সদস্যের, পটিয়ায় আট সদস্যের, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় পাঁচ সদস্যের এবং বোয়ালখালীতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১০ দিনের মধ্যে ইউনিয়নগুলোর দলীয় প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে দক্ষিণ জেলা বিএনপি বরাবর উপস্থাপনের জন্য কমিটিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউনিয়ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী এই বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে এক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ, এলাকার জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত গ্রহণ এবং বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক অবস্থান, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, কারাবরণ এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে জেলা বিএনপির এ ধরনের কমিটি গঠনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন একাধিক সংসদ সদস্য। তাদের মতে, জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ে অবশ্যই স্থানীয় সংসদ সদস্যরা মূল ভূমিকায় থাকবেন। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের যাবতীয় উন্নয়ন ও সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেন জনপ্রতিনিধিরা। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্ক ও সমন্বয় থাকতে হবে। তাই সংসদ সদস্যরাই নিজ নিজ এলাকায় ইউনিয়ন নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাই করবেন। সাংগঠনিক দায়িত্বশীলরা সাংগঠনিক বিভিন্ন গঠন, শৃঙ্খলা রক্ষা এসব দায়িত্ব পালন করবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের বাদ দিয়ে কারও অযাচিত হস্তক্ষেপ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন ও অনৈক্য সৃষ্টি করবে, যা আমাদের কারও কাম্য নয়।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও বাঁশখালীর সাবেক পৌর মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী এ প্রসঙ্গে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন অপরিহার্য। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোনো ধরনের অনৈক্য কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে কিংবা দল সমর্থিত একাধিক প্রার্থী হয়ে গেলে বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্রার্থীরা এতে লাভবান হবে। এ বিষয়ে বিরোধ এড়াতে দলের প্রতি আনুগত্য ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৯০টি। প্রত্যেকটি ইউনিয়নেই বিএনপি সমর্থিত ৫ থেকে ৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত একক প্রার্থী বিভিন্ন ইউনিয়নে তৎপর রয়েছেন। এ ছাড়া দলীয় পরিচয়ের বাইরে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় অনেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলীয় নির্বাচন না হওয়ায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী সমর্থিত অনেকের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দের এমন অনেক প্রার্থীও রয়েছেন এলাকার সাধারণ জনগণের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে। আবার অনেকে আছেন এলাকায় জনপ্রিয়। কিন্তু নেতাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা নেই। এক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল সম্পর্ক ও ব্যক্তি পছন্দের কারণে দলীয় মনোনয়ন পেলে ভোটের মাঠে হিতে বিপরীত হতে পারে।