ভূবৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

পৃথিবী বৈচিত্র্যময়। কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও বিস্তীর্ণ সমতলভূমি। এই বৈচিত্র্য পৃথিবীকে যেমন সুন্দর করেছে, তেমনি মানুষের জীবনযাত্রাকেও বৈচিত্র্যময় করেছে। আর এসব কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক দৃশ্য নয়। পৃথিবীর প্রতিটি বৈচিত্র্যের মধ্যে আল্লাহর কুদরত, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশক্তির নিদর্শন রয়েছে।

কোরআন মানুষকে বারবার পৃথিবীর দিকে তাকাতে, এর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে এবং আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা নিতে আহ্বান করেছে। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, মাটি, উদ্ভিদ ও নানা ধরনের ভূপ্রকৃতি মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। এগুলো নিয়ে চিন্তা করলে মানুষের মনে স্রষ্টার মহত্ত্বের অনুভূতি জাগে।

আল্লাহ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। কোথাও পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, কোথাও নদী প্রবাহিত করেছেন, কোথাও সমতল ভূমি বিস্তৃত করেছেন। সুরা নাহলের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়। আর সৃষ্টি করেছেন নদী ও পথসমূহ, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার।’

এই আয়াতে পাহাড়, নদী ও পথের কথা একসঙ্গে এসেছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। পাহাড় পৃথিবীর ভূদৃশ্যকে বদলে দেয়। নদী মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। পথ মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে সাহায্য করে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূপ্রকৃতি মানুষের জীবনকে নানাভাবে সহজ করেছে।

পাহাড় : পৃথিবীর ভূবৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাহাড়। বিশাল বিশাল পর্বতমালা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভূদৃশ্যকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। পাহাড়ের কোথাও তুষার, কোথাও সবুজ বন, কোথাও পাথুরে ঢাল। আবার কোনো কোনো পাহাড়ের গায়ে বিভিন্ন রঙের শিলাস্তর দেখা যায়।

কোরআনে আল্লাহ পাহাড়ের রঙের বৈচিত্র্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। সুরা ফাতিরের ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দিয়ে আমি বিভিন্ন রঙের ফল উৎপন্ন করি। আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিভিন্ন বর্ণের পথ, সাদা, লাল এবং নিকষ কালো।’

আয়াতটি পাহাড়ের মধ্যকার রঙ ও গঠনের বৈচিত্র্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন রঙ ও বৈশিষ্ট্যের পাহাড়। এটি আল্লাহর সৃষ্টিশৈলীর বৈচিত্র্য বোঝায়।

পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে একজন মুমিন শুধু তার বিশালতা দেখবে না। সে এর পেছনে থাকা স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা নিয়েও চিন্তা করবে। কোরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি মানুষের জন্য চিন্তা ও উপলব্ধির একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র।

নদী ও সমুদ্র : পৃথিবীর ভূবৈচিত্র্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নদী ও সমুদ্র। নদী কোথাও সরু, কোথাও প্রশস্ত। কোথাও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে, কোথাও বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি অতিক্রম করেছে। নদীর তীর ঘিরে গড়ে উঠেছে জনপদ,

কৃষি ও বাণিজ্য। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

সমুদ্রও পৃথিবীর বিশাল ভূপ্রকৃতির অংশ। এর বিশালতা মানুষের সামনে আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপকতা তুলে ধরে। সমুদ্র মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। কোরআনে সমুদ্রের নানা উপকারের কথা এসেছে। আল্লাহ মানুষকে স্থল ও জলপথে চলাচলের সুযোগ দিয়েছেন এবং সমুদ্র থেকে বিভিন্ন উপকার গ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন।

ভূবৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন : পৃথিবীর সব জায়গার মাটি এক নয়। কোথাও মাটি উর্বর, কোথাও শুষ্ক। কোথাও কৃষির জন্য উপযোগী সমতল ভূমি, কোথাও পাথুরে এলাকা। কোনো অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হয়, আবার কোনো অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ খুব কম।

এই বৈচিত্র্যের কারণে মানুষের জীবনযাত্রাতেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কোথাও ধান, কোথাও গম, কোথাও খেজুর, কোথাও আঙুর, কোথাও নানা ধরনের ফল ও শস্য উৎপন্ন হয়। মানুষ স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বসতি গড়ে তুলেছে এবং এগুলোর মাধ্যমে জীবিকার উপায় অবলম্বন করেছে।

সুরা ফাতিরের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বৃষ্টির পানি থেকে বিভিন্ন রঙের ফল উৎপন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। একই আয়াতে পাহাড়ের বিভিন্ন রঙের কথাও এসেছে। অর্থাৎ প্রকৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। পানি, মাটি, উদ্ভিদ ও ভূপ্রকৃতি মিলেই পৃথিবীর জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

ভূবৈচিত্র্য আল্লাহর নেয়ামত : মানুষ সাধারণত প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করার দিকটি বেশি দেখে। কিন্তু একজন মুমিন এসব সম্পদের পেছনে আল্লাহর অনুগ্রহও দেখতে শেখে। পাহাড় মানুষের জন্য খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস। নদী পানি ও জীবিকার উৎস। উর্বর ভূমি খাদ্য উৎপাদন করে। মানুষ ও প্রাণীর জন্য বন নানা উপকার বয়ে আনে। সমুদ্র খাদ্য ও জীবিকার পাশাপাশি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।

তাই পৃথিবীর ভূবৈচিত্র্য মানুষের জন্য আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের একটি অংশ। এসব নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও জরুরি।

প্রকৃতি ধ্বংস নিষেধ : ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছে। মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া আমানতের দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী। তাই প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়, পরিবেশ দূষণ ও নির্বিচারে ধ্বংসের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম ৪১)

এই আয়াত মানুষের কর্মকা-ের সঙ্গে স্থল ও জলভাগের বিপর্যয়ের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে। পৃথিবীর ভূমি, নদী, সমুদ্র ও অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করা শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। একজন মুসলমানের কাছে এটি দায়িত্ববোধেরও বিষয়।

ইমানকে জাগ্রত করার মাধ্যম : ভূবৈচিত্র্য নিয়ে চিন্তা করলে ইমান বাড়ে। ইসলাম প্রকৃতি দেখাকে শুধু সৌন্দর্য উপভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাহাড়ের বিশালতা, নদীর প্রবাহ, সমুদ্রের গভীরতা, মরুভূমির বিস্তৃতি এবং সবুজ ভূমির সৌন্দর্য মানুষের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। এই পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হলো? এত বৈচিত্র্য কোথা থেকে এলো? কে এর নিয়ম ও ভারসাম্য নির্ধারণ করলেন?

একজন মুমিন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করে। কোরআনে মানুষের জ্ঞান ও উপলব্ধির সঙ্গে সৃষ্টিজগতের নিদর্শনকে যুক্ত করা হয়েছে। সুরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতে মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তু ও গবাদিপশুর বিভিন্ন রঙের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং জ্ঞানীদের আল্লাহভীতির কথা বলা হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, সৃষ্টির বৈচিত্র্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা মানুষের জ্ঞান ও আল্লাহভীতিকে জাগ্রত করে।

পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। পাহাড়ি অঞ্চল আমাদের সামনে এক ধরনের সৌন্দর্য তুলে ধরে। সমুদ্রতীর অন্য রকম দৃশ্য তৈরি করে। মরুভূমির বিস্তৃতি ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করে। নদীমাতৃক ভূমি আবার মানুষের জীবনকে অন্যভাবে গড়ে তোলে। এসব বৈচিত্র্যের মধ্যে কোনোটি অপ্রয়োজনীয় নয়। আল্লাহর সৃষ্টিতে প্রতিটি ভূপ্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা রয়েছে।

মানুষের দায়িত্ব হলো, এসব নেয়ামতকে চিনতে শেখা। আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে তার প্রশংসা করা। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে সংযমী হওয়া। নদী, পাহাড়, বন, সমুদ্র ও ভূমিকে অযথা নষ্ট না করা। কারণ পৃথিবীর এই বৈচিত্র্য শুধু মানুষের ভোগের জন্য নয়। এর সঙ্গে অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনও জড়িয়ে আছে।

পৃথিবীর ভূবৈচিত্র্য মুমিনের কাছে শুধু ভূগোলের বিষয় নয়। এটি আল্লাহর কুদরত উপলব্ধির একটি মাধ্যম। পাহাড় তার শক্তির কথা মনে করায়। নদী তার নেয়ামতের কথা স্মরণ করায়। উর্বর ভূমি তার অনুগ্রহের কথা জানায়। সমুদ্র তার সৃষ্টির বিশালতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর পৃথিবীর বৈচিত্র্য মানুষকে শেখায়, একজন স্রষ্টার সৃষ্টি কত বিচিত্র ও বিস্ময়কর হতে পারে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত