লোনাপানির কুমির

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

ওকে প্রথম দেখি ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টায় দুবলার চর থেকে ফেরার পথে হাড়বাড়িয়ার কাছাকাছি পশুর নদীর তীরে। কিন্তু ওর নিশ্চল দেহটিকে প্রথম দর্শনে একটি মরা গাছের গুঁড়ি ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। অবশ্য বেশ দূর থেকে দেখেছিলাম ওকে। তারপরও ক্যামেরায় একটি সাক্ষী ছবি তুলে রেখেছিলাম। বাসায় ফিরে ল্যাপটপে ছবি ডাউনলোড করে জুম করতেই ওটিকে আর গাছের গুঁড়ি মনে হলো না। আসলে শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণীটি সে সময় নদীর পাড়ে নিশ্চল হয়ে শেষ বিকেলের রোদের আমেজ নিচ্ছিল।

চার বছর পর ১৭ জানুয়ারি দুপুরে কুপিলমণি থেকে ফেরার পথে হাড়বাড়িয়া খালপাড়ে ওকে আবারও দেখলাম ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু টাইগার ফার্ন ও লম্বা লম্বা ঘাসের আড়ালে থাকায় ভালো ছবি তুলতে পারলাম না। পরের বছর ২৬ জানুয়ারি মাংসাশী প্রাণীটিকে সকাল ১০টায় দেখলাম আন্ধারমানিক নদীর পাড়ে। দুপুর পৌনে ৩টায় আবারও দেখা হলো দুধমুখী ও সুপতির মাঝামাঝি সম্ভবত ভোলা নদীর পাড়ে রোদ পোহাতে। সেদিন সর্বশেষ ওকে দেখলাম সুপতি ও কচিখালির মাঝামাঝি স্থানে বিকেল ঠিক ৪টায়। চমৎকারভাবে শেষ বিকেলের রোদে তাপিয়ে নিচ্ছিল নিজেকে। এবার বেশ ভালো ছবি তোলা গেল কাছ থেকে। কটকা থেকে ফিরতি পথে ২৮ জানুয়ারি দুপুর সোয়া ২টায় আবারও দেখলাম হাড়বাড়িয়া খালপাড়ে। ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’ থেকে ছবি তুলতে তুলতে বেশ কাছে চলে আসায় ও শেষ পর্যন্ত কাদাপাড় থেকে ঝপাৎ করে পানিতে নেমে ডুব দিল। সর্বশেষ সুন্দরবনে প্রাণীটিকে দেখলাম ২০২৩ সালের মার্চে।

এতক্ষণ সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে দেখা শীতল রক্তবিশিষ্ট যে প্রাণীটির গল্প বললাম সে এদেশের এক বিরল ও বিপন্ন সরীসৃপ লোনাপানির কুমির। ইংরেজি নাম Estuarine/Saltwater/Marine/Sea/Indo-pacific Crocodile বা Saltie। ক্রোকোডাইলিডি গোত্রের সরীসৃপটির বৈজ্ঞানিক নাম Crocodylus porosus। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, পাপুয়া নিউগিনি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলিয়া ও মাইক্রোনেশিয়ার দেখা যায়।

বিশ্বের সব জীবিত সরীসৃপের মধ্যে লোনাপানির কুমিরই বৃহত্তম। সচরাচর পুরুষের দৈর্ঘ্য ও ওজন যথাক্রমে ৪.৩-৫.২ মিটার ও ৪০০-১,০০০ কেজি হয়। তবে সর্বোচ্চ ৬-৭ মিটার ও ২,০০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। সে তুলনায় স্ত্রী অনেক ছোট, ২.৪-৩.০ মিটার ও কমবেশি ১০০ কেজি। সদ্যফোটা বাচ্চাগুলো দৈর্ঘ্যে মাত্র ২৫-৩০ সেন্টিমিটার ও ওজনে মাত্র ৭০ গ্রাম। মাথা অত্যন্ত বড় ও নাক বেশ চওড়া। মুখবন্ধনী মিঠাপানির কুমিরের থেকেও লম্বা। চোখ থেকে নাকের কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত একজোড়া খাঁজ থাকে। দেহের ওপরের চামড়া গাঢ় সবুজাভ-নিষ্প্রভ বাদামি, তাতে অল্পকিছু হালকা তামাটে বা ধূসর ছোপ রয়েছে। ধূসর লেজে কালো বন্ধনী থাকে। অল্পবয়স্কগুলোর বর্ণ ফ্যাকাশে হলুদ। দেহ ও লেজে কালো ডোরা ও ফোটা থাকে। দেহের নিচটা সাদা বা হলুদ।

এরা উপকূলীয় নদী, মোহনা ও বাদাবনের লোনাপানির প্রাণী। অনেক সময় মিঠাপানির নদী ও জলাশয়েও দেখা যায়। এদেশে একমাত্র সুন্দরবনেই পাওয়া যায়। দিবাচর ও নিশাচর প্রাণীগুলো বেশ অলস। এরা সচরাচর আধা-জলচর। প্রত্যেকেরই একটি নিজস্ব বিচরণ এলাকা থাকে। সেই এলাকায় সচরাচর অন্যরা প্রবেশ করে না। নিজস্ব বিচরণ এলাকায় প্রাপ্ত যেকোনো প্রাণী, যেমন মাছ, কাঁকড়া, সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, এমনকি মানুষ পর্যন্ত খেতে পারে।

এদেশে এরা সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে প্রজনন করে। বাসা তৈরির জন্য স্ত্রী কুমির জোয়ারের পানি থেকে নিরাপদ এমন নির্জন কাদাময় নদীর পাড়, উঁচু তটরেখা অথবা জোয়ার-ভাটার খাঁড়ির পাশে অবস্থিত জলাভূমির সীমানা বেছে নেয়। এরপর কাদা, পাতা ও পচনশীল উদ্ভিদের সমন্বয়ে একটি বড় ঢিবির মতো বাসা তৈরি করে। এই পচনশীল উদ্ভিদ ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ উৎপাদন করে। নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে স্ত্রী ৪০-৬০টি ডিম পাড়ে যা প্রায় ৮০-৯০ দিনে ফোটে। স্ত্রী ১০-১২ বছরে ও পুরুষ ১৬ বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ৪০-৮০ বছর।  

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত