রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হককে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে এ ঘটনা ঘটায়। এ সময় তারা উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে মারধর করে তাঁর কাছ থেকে চাকরির ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর আদায় করেন।
এই ঘটনার পর আর ক্যাম্পাসে যেতে পারছেন না উপাচার্য। বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবগত করেছেন। জানিয়েছেন স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও। এদিকে, এ ঘটনায় কারা জড়িত, এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি উপাচার্য। তবে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একটি অংশ ভিসি ডা. জাওয়াদুলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে। মঙ্গলবারের বিক্ষোভেও একাধিক বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হেনস্তার শিকার কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ ব্যানার নিয়ে একদল ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। পরে তারা উপাচার্য ডা. জাওয়াদুল হকের কক্ষে গিয়ে তাঁর ওপর চড়াও হয়। আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ স্থানীয়দের না দিয়ে ঢাকার ঠিকাদারদের দেওয়ার অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে তারা নিজেদের লিখে আনা একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এরপর তারা সেকশন অফিসার নাজমুলকে মারধর করে চাকরির ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর নেন।
এরপর তারা উপাচার্যকে কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ এবং সিসিটিভি ফুটেজের যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যান। বের হয়ে যাওয়ার সময় অফিসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই ঘটনার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।
এ ঘটনা নিয়ে বিকেলে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্ট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলন করেন উপাচার্য ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক। তিনি বলেন, ‘মিটিং চলাকালে বাইরে হট্টগোলের শব্দ শুনতে পাই। পরে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল পিয়নদের ধাক্কা দিয়ে আমার দপ্তরে প্রবেশ করে। তারা আমাকে বলে, আপনি আওয়ামী লীগের দোসর। আপনি রাজশাহীর মানুষকে কাজ দেন না, ঢাকার মানুষদের কাজ দেন। আপনি এই চেয়ারে থাকতে পারবেন না। এ সময় তারা আমাকে কঠোর ভাষায় চেয়ার থেকে উঠে আসতে বলে এবং পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। পদত্যাগপত্রটি তারা আগেই টাইপ করে নিয়ে এসেছিল। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, আমি স্বাক্ষর না করলে অন্যদের মতো আমার সঙ্গেও খারাপ আচরণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করি।’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘এরপর তারা আমাকে দপ্তর থেকে বের করে দেয়। আমার মোবাইল ফোনও তারা কেড়ে নেয় এবং আমাকে গালাগাল করতে থাকে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘এ সময় তারা আমার কম্পিউটারে থাকা শিডিউল ও বিভিন্ন তথ্য মুছে দেয়। একই সঙ্গে ওয়াই-ফাই, ইন্টারনেট সংযোগ এবং সিসিটিভির ফুটেজও নষ্ট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে আমার দপ্তরের সব কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।’
কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘তাদের আমি সেভাবে চিনি না। এর আগেও তারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন ছিল কি না, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।’
কার্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন জানান, সকাল ১০টা থেকে উপাচার্য মহোদয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি অনলাইন বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। একদল লোক মিছিল নিয়ে জোর করে কক্ষে প্রবেশ করে উপাচার্যকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং পূর্বপ্রস্তুতকৃত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়। এরপর আমাকেও ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। আমি এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমাকে মারধর করে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি ফোনে খবর পেলাম, একদল লোক রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যারকে অবরুদ্ধ করেছে। আমি গিয়ে দেখলাম, ভিসি স্যারের রুম তালাবদ্ধ। সংঘবদ্ধ কাউকে পেলাম না। এ ব্যাপারে কেউ এখনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে রাজশাহী সদর আসনের এমপি ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘এই কাজ যারাই করুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’