বিদ্যুতে নতুন ধাক্কা ভারত নির্ভরতায়

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

ভারত নির্ভরতার ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন ধাক্কা লেগেছে। বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কয়লা সংকটে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার। ঝাড়খ-ের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের একটি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। এতে প্রতিদিন অন্তত ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে পিডিবি। এক মাস ধরে সরবরাহ বন্ধ বা কম থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ ৪৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। একইভাবে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ সরবরাহ মাঝেমধ্যেই কমিয়ে দিচ্ছে ভারত।

ভারতের ঝাড়খ-ের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে এক হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করতে পারে আদানি পাওয়ার। কিন্তু গত মাসের শেষ দিকে এসে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমায়। এখনো যা অব্যাহত রয়েছে। আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, দুটি ইউনিটের একটি এখন বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, গোটা ভারতজুড়ে কয়লার সংকট দেখা দিয়েছে।

দেশটির ১৯০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯০টি কেন্দ্রের কয়লার মজুদ কমে গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, চাহিদার মাত্র ৩৩ ভাগ কয়লার মজুদ রয়েছে কেন্দ্রগুলোতে।

আদানির ঝাড়খ-ের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবলমাত্র বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। চাহিদা বেশি থাকলে কেন্দ্রটি এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কিন্তু ভারতজুড়ে কয়লা সংকট শুরু হলে আদানিতেও তার প্রভাব পড়ে।

এ বিষয়ে আদানি পাওয়ারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে চায়নি। তবে আদানির একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতজুড়ে কয়লা সংকটের কারণে তাদের কেন্দ্রটিতেও প্রভাব পড়েছে। যা খুব শিগগিরই সমাধান হতে পারে।

অন্যদিকে ভেড়ামারা এইচভিডিসি সাবস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে মাঝেমধ্যেই সরবরাহ কমিয়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটে নামানো হচ্ছে। তবে ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

বাংলাদেশ কতটা ভারতনির্ভর : সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মোট ১৬ হাজার মেগাওয়াট থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের তিনটি উৎস থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৫ ভাগই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করার নীতি গ্রহণ করা হয়। তখন ভারত ছাড়াও নেপালের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি হয়। সম্প্রতি নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ ভূমিধসের পর নেপাল থেকে আসা ৪০ মেগাওয়াট সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোতে যে ক্ষতি হচ্ছে : বছরের অক্টোবর মাসেও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না পিডিবি। এতে প্রতিদিন এখনো দিনের কোনো কোনো সময় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর মধ্যে আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোতে সরকারকে চাহিদা সামাল দিতে অতিরিক্ত তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। আদানি স্বাভাবিক থাকলে অর্থাৎ দুটি ইউনিট চালু থাকলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। কিন্তু বন্ধ থাকাতে এখন কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, কয়লাচালিত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যায় গড়ে ১৩ টাকা করে। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েলের সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি পাওয়াতে গড়ে প্রতি ইউনিটের জ্বালানি খরচ হয় ২৪ টাকা। এর বাইরে আরও এক টাকা ৫০ পয়সা থেকে দুই টাকা পর্যন্ত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ধরলে প্রতি ইউনিটের দাম দাঁড়ায় ২৬ টাকা করে। অর্থাৎ যে বিদ্যুৎ কয়লা থেকে ১৩ টাকায় পাওয়া যেত, সেই বিদ্যুৎ ফার্নেস অয়েল থেকে ২৬ টাকায় উৎপাদন করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৩ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মতো। এক মাস বন্ধ থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ ৪৫০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আদানি উৎপাদন কমিয়েছে আগস্ট থেকে : গত ২৮ আগস্ট রাত ১টায় আদানি থেকে বাংলাদেশে এক হাজার ৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এরপর রাত ২টায় উৎপাদন ২০০ মেগাওয়াট কমিয়ে ৮৮১ মেগাওয়াট করে। এর দুদিন পর গত ৩০ আগস্ট ভোর ৫টায় উৎপাদন কমাতে শুরু করে আদানি। এর এক ঘণ্টা পর আদানি কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে উৎপাদন ৫০৭ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনে। এরপর আর ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত আদানির উৎপাদন ৫০০ থেকে ৬৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে।

আইনে অনুসারে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কাটতে পারবে পিডিবি : বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে আদানির ক্ষেত্রে বলা আছে, কোনো কারণে বাংলাদেশ কেন্দ্রটির ৩৪ ভাগের কম বিদ্যুৎ নিলে পিডিবির জরিমানা (এলডি) দিতে হবে। আর কেন্দ্রটি পিডিবির চাহিদামতো পুরো এক হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় যে পরিমাণ বিদ্যুতের চাহিদা দেবে, ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ তারা সরবরাহ করবে। তবে প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে একটি নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে পারে। কেন্দ্রগুলো সারা বছর যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তা ধরে এই হিসাব করা হয়। বহুলভাবে এটাকে আউটেজ বলা হয়। কয়লাচালিত কেন্দ্র বছরে ১৫ ভাগ আউটেজ পেয়ে থাকে। কোনো কারণে কেন্দ্রটি বন্ধের সীমা ১৫ ভাগ আউটেজ অতিক্রম করলে তাকে পৃথকভাবে জরিমানা দিতে হয়। কেন্দ্রটিকে যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া হয়, তা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ আদানি যদি এই আউটেজ সীমা অতিক্রম করে, তাহলে পিডিবি তার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কেটে নিতে পারবে। যা প্রতি ইউনিটে সাড়ে চার সেন্টের মতো।

ভারতে তীব্র কয়লা সংকট : রয়টার্স গত ৬ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে জানায়, চলতি বছর ভারতের দীর্ঘায়িত গ্রীষ্ম এবং এল নিনোর প্রভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে তাপবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি হারে চললেও ভারতের বিদ্যুৎ ঘাটতি তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) এপ্রিলে ১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন থেকে কমে বর্তমানে ৫৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কয়লাখনি এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে স্থানীয় সরবরাহ কমে যাওয়ায় মজুদ বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর ভারতের এই সংকট এখন বাংলাদেশের ওপরও এসে পড়েছে।

পিডিবি কী ভাবছে : পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, আদানি অনেক বারই তাদের দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসবে বলে জানিয়েছে, কিন্তু আসেনি। তাই নতুন করে যে তারিখ দিয়েছে তা প্রকাশ করতে চাই না। তিনি জানান, আমরা যদি বিদ্যুৎ নিতে না পারি তাহলে এলডি বা জরিমানার বিধান রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তেমনটা রয়েছে। আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ না করায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদা মেটানো হচ্ছে।

পিডিবির আইপিপি সেল (প্রাইভেট জেনারেশন)-এর পরিচালক মো. আব্দুল হক জানান, বাৎসরিক যে আউটেজ আছে তা অতিক্রম করলে জরিমানা করার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রেও তা করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে আদানি চুক্তির বরখেলাপ করছে : পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, বিদ্যুতের মতো পণ্যে পরনির্ভরশীলতার বদলে স্বনির্ভরতা প্রয়োজন। আমাদের দেশের মধ্যে কেন্দ্র থাকলে আমরা উদ্যোগী হয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারি। কিন্তু অন্য কোনো দেশে কেন্দ্র থাকলে তারা কোনো কারণে বিপাকে পড়লে আমরা বিপাকে পড়তে পারি এটা মাথায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ না করে চুক্তির বরখেলাপ করছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে বিশেষভাবে দেখা। আমরা আগে থেকে বলে এসেছি আদানির চুক্তি রিভিউ করতে। এখন যা করার উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত