গুমানীর ওপারে জীবন, মাঝে সেতুহীন অপেক্ষা

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

গুমানী নদীর দুই পাড়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু এই অল্প দূরত্বই বছরের পর বছর ধরে দীর্ঘ দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে হাজারও মানুষের জীবনে।

নদীর ওপারে বাজার, স্কুল, খেতখামার, ইউনিয়ন পরিষদ—সবই আছে। নেই শুধু একটি সেতু। তাই প্রতিদিন খেয়া, বাঁশের চারাট আর অনিশ্চিত পারাপারের ওপর ভরসা করেই চলতে হচ্ছে গুরুদাসপুর ও তাড়াশ উপজেলার সীমান্তবর্তী অন্তত ১০ গ্রামের মানুষকে।

ধামাইচ বাজার ঘাটে সেতু নির্মাণের দাবি বহু বছরের। এক বছর আগে মাপজোখ ও সম্ভাব্যতা যাচাই হওয়ায় স্থানীয়দের মনে জেগেছিল আশার আলো। কিন্তু এরপর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সেই আশাই এখন ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে।

গুমানী নদীর দক্ষিণ পাড়ে ধামাইচ বাজার। গুরুদাসপুরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে প্রতিদিন আসে নদীর উত্তর পাড়ের হেমনগর, নওখাদা, কাটাবাড়ি, বিন্নাবাড়ি ও সবুজপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, কৃষিপণ্য বিক্রি, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার প্রয়োজনে তাঁদের নদী পার হতেই হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ পাড়ের ধামাইচ, ঈশ্বরপুর বাহাদুরপাড়া ও রানীগ্রামের মানুষের কৃষিজমির বড় অংশ রয়েছে নদীর উত্তর পাড়ের বিস্তীর্ণ চলনবিলে। চাষাবাদ, ফসল কাটা এবং উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলার প্রতিটি ধাপেই নদী পারাপার যেন বাড়তি এক লড়াই।

বর্ষায় এই দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়। নদী ফুলে ওঠে, স্রোত বাড়ে, খেয়া পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে স্কুলগামী শিশুরা।

ধামাইচবিলচলন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মুকুল হোসেন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা জানান, বর্ষাকালে উত্তাল নদী পার হয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়। অনেক অভিভাবক ঝুঁকির কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। এতে উপস্থিতিও কমে যায়।

তাঁদের মতে, এখানে একটি সেতু নির্মিত হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে।

ধামাইচ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকায় পণ্য ওঠানো-নামানোয় বাড়তি শ্রম দিতে হয়। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

স্থানীয় শিক্ষক আবুল বাসার এনাম বলেন, উত্তর পাড়ের বাসিন্দাদের তাড়াশ উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের কুন্দইলে নাগরিক সেবা নিতে যেতে হয়। শুকনো মৌসুমে কোনোভাবে যাতায়াত করা গেলেও বর্ষায় তা কঠিন হয়ে পড়ে। সেতু হলে বাজার, শিক্ষা ও কৃষির পাশাপাশি প্রশাসনিক যোগাযোগও সহজ হবে।

ঘাটের মাঝি লিটন সরদার জানান, মানুষের চাপ সামলাতে দুটি খেয়া নৌকা চালাতে হয়। এতে মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আবার শুকনো মৌসুমে পানি কমে গেলে বাঁশের চারাট নির্মাণে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

তাঁর ভাষায়, সেতু হলে মানুষের সময়, শ্রম আর অর্থ—সবই বাঁচবে।

তাড়াশ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবাদ হোসেনের নেতৃত্বে সেতুর মাপজোখ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। তবে এরপর আর নতুন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আয়নুল হক বলেন, ধামাইচ বাজার ঘাটে সেতু নির্মাণ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডিমান্ড নোট বা ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশা, আগামী শুকনো মৌসুমে দরপত্র আহ্বান করে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

একটি সেতু এখানে শুধু ইট, বালু আর কংক্রিটের কাঠামো হবে না। এটি হবে দুই পাড়ের মানুষের জীবনকে কাছে টেনে আনার পথ। স্কুলে যাওয়া শিশুর নিরাপত্তা, কৃষকের ফসলের বাজার, রোগীর দ্রুত চিকিৎসা, মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই একটি সেতুর স্বপ্ন।

তাই গুমানীর দুই পাড়ে এখনো অপেক্ষা। নদীর স্রোত বয়ে যায়, ঋতু বদলায়, বছর পেরোয়—কিন্তু মানুষের প্রশ্ন রয়ে যায় একই: কবে কাগজের সম্ভাব্যতা বাস্তবের সেতু হয়ে দাঁড়াবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত