গল্প

শ্যাম ও দুখজাগানিয়া

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

মানবজাতির কল্যাণ সাধনে ইঁদুরের ভূমিকা নিয়ে আলাপটা জমে উঠছিল। এ আলোচনায় জগমোহনই মূল বক্তা, আমরা বাকি দুজন কেবল শুনছি। তবে আচমকা প্রশ্নবাণ ছুড়ে না দিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যায় সে কখনোই যায় না। জগমোহন অর্থাৎ মোহন ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল—বলো দেখি ইঁদুরের মস্তিষ্কের সঙ্গে মানুষের কী কী অমিল রয়েছে?

সদ্য পড়া রিসার্চ পেপার থেকে মিলগুলো আমার মোটামুটি জানা হয়ে গেছে। সেসব বলতে শুরু করেছি কি, মোহন মাথা দুলিয়ে হেসে উঠল—উহু, মিল নয়, অমিল, অমিলগুলো শুনতে চাই, ব্রো!

আমাদের কথাগুলো রামিনার কানে যাচ্ছে কি না ঠিক বুঝতে পারা গেল না। আমার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ওর নীল রঙের হাত দুটোর দিকে। হাত দুটোর নাগালে আসতেই মুহূর্তের মধ্যেই খুদে প্রাণীগুলো নেতিয়ে পড়ছে। একবার শ্বাসরোধ নিশ্চিত হলেই ঝটপট প্যাকেটে ঢুকে পড়ছে নিথর শরীরগুলো। কে জানত এত সুন্দর মুখ যার তার হাতের কাজ এমন নিষ্ঠুর!

ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রামিনা। নীল আবরণ দুটো খুলে ফেলার পর আমি অপেক্ষায় থাকি কখন সে মাস্কটাও খুলবে আর মুখখানা দেখতে পাব। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, আর ইউক্যালিপটাসের পাতার মতো ধারালো চোখ। মাস্ক খুলতেই আমার অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়ে সে বলে উঠল—ইয়োর টার্ন!

এমন অদ্ভুতভাবে আমি ইঁদুর মারতে শিখে যাব তা কে জানত! শুরুর দিকে একটু মন খারাপের মতো হলেও এখন কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। মোহন বলে—ইটস ইউথ্যানেশিয়া, ম্যান! পার্ট অব দ্য প্রোটোকল!

এ ব্যাপারে দ্বিমত করতে পারি না; অন্তত ট্রেনিংয়ে তো তাই শিখিয়েছে। আগে যদি এ কায়দা জানা থাকত, তবে বইপত্র কেটে রাখার দায়ে কতশত ইঁদুর আমার হাতেই নিধন হতে পারত! একবার অতিষ্ঠ হয়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল মা। প্রথম দফায় গোটা চারেক ইঁদুর মরেছিল, কিন্তু সপ্তাখানেকের মধ্যেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম; খাবারগুলো যেমন ছড়ানো ছিল, সেভাবেই পড়ে রইল, কেউ সেগুলো মুখে তুলল না। তাইতো ভাবছি এদের মস্তিষ্ক কি সত্যিই আলাদা?

ভিভারিয়ামের ভেতরে লাল আলোতে বসে মনে হয় কুব্রিকের ‘এ স্পেস অডিসি’র কোনো দৃশ্যে আটকে গেছি। লাল পেন্সিলটা হলুদ হয়ে যায়, পরনের ল্যাবকোটও অন্য রঙের দেখায়। এই ঘরে রোজ প্রায় আট ঘণ্টা করে সময় কাটাই। আজ আমার সামনে ছয়টি খাঁচা, প্রতিটিতে একটি করে ইঁদুর। একটু পরেই পানিভর্তি গামলায় সাঁতরাবে এরা, তারপর উঁচু দেয়াল ঘেরা চৌকো বাক্সের ভেতর ছেড়ে দিয়ে এদের গতিবিধি দেখব। নতুন করে যোগ হতে পারে গান শোনাবার পর্বটিও।

গানের ব্যাপারটা নিয়ে এখনো কিছুটা ইতস্তত বোধ করছি। সত্যি বলতে এই ল্যাবে এর আগেও অডিটোরি স্টিমুলেশন নিয়ে যে কাজ হয়নি তা নয়, নির্দিষ্ট রেঞ্জের শব্দ শুনিয়ে ইঁদুরদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু আমার হাইপোথিসিস শুনে সুপারভাইজার খানিকটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তারপর সশব্দে হেসে উঠেছেন। সাপ্তাহিক মিটিং ছিল সেদিন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনার রুমের ভেতরে আমি প্রায় ঘেমে উঠেছিলাম। মোহন ঢুকেছিল খানিকটা দেরিতে, আর উল্টোদিকের চেয়ারে বসে থাকা রামিনার নিরুত্তাপ উদাসীনতায় বাতাসটা আরও ভারী হয়ে উঠেছিল।

সে রাতে প্রায় জোর করে আমাকে এক ভিয়েতনামিজ রেস্তোরাঁয় ধরে নিয়ে গেল মোহন। বিলটা সে দেবে, তাই আমার কোনো রকম আপত্তি শোনেনি। ভেতরে রামিনাকে দেখতে পেয়ে মনে হলো এসে ঠিকই করেছি। আলো আঁধারিতে ফোনের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে কিছু একটা বলল সে; আমি যন্ত্রচালিতের মতো উত্তরে বলে উঠলাম—ধন্যবাদ!

কাজের উদ্যম ফিরে পেলাম সুপারভাইজারের সঙ্গে বোঝাপড়াটা হওয়ার পর, যাকে বলে একেবারে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। মোহন আমার উত্তেজনা দেখে হেসে ওঠে, বলে—এ দেশের ইঁদুরগুলো তোমার বাংলা গান বুঝবে তো? ব্যাপারটা কিন্তু মাথায় রেখো।

মোহনের সব কথা যে ধরতে নেই তা বেশ বুঝে গেছি। রামিনার প্রস্তাবটা বরং দারুণ লাগল আমার। গানের তালিকাটি সে তৈরি করে দেবে, এতে আমার অজান্তে প্রিয় গানগুলো বেছে নেবার কারণে যে সাবকনশাস বায়াস বা পক্ষপাতের ঝুঁকিটা ছিল তা আর থাকবে না। আগামী দু’মাসের মধ্যে ডেটা দিয়ে প্রফেসরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আমার প্রজেক্টের কাজ শুরু হতে পারে, অন্তত প্রফেসর তাই বললেন আমায়। সব মিলিয়ে উত্তেজনায় রাতে ভালো করে ঘুমই হলো না।

আমার যে হার্ট রেট বেড়ে যাচ্ছে, রামিনার সামনে সে কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। ভিভারিয়ামের ওই আলোয় অস্বস্তি হয় বলেই হয়তো ধুকপুক বেড়ে যেতে পারে, তাই কথাটিকে সে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিল! এ তথ্যের পক্ষে নিশ্চয়ই দশ-বারোটি রেফরেন্সও সে দিতে পারবে; কিন্তু রামিনা তা না করে ডেটার ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের কতটা নিরপেক্ষ হতে হয় তাই নিয়ে বেশ লম্বা বক্তব্য শুনিয়ে গেল। কথার মাঝেই অন্যমনস্ক হতে হতে মনে হলো ওকে বলি আমাদের উচ্চতার ব্যবধান আশ্লেষের জন্য একেবারে মানানসই। আচ্ছা সে কি জানে এই একই লেকচার যদি মোহন শোনাত আমি কি মাঝপথে মোহনকে থামিয়ে দিতাম না? অন্তত এক্ষেত্রে আমি একেবারেই নিরপেক্ষ হতে পারি না।

রামিনার কথামতো ল্যাব প্রোটোকল পড়তে গিয়ে জানলাম ইঁদুরগুলো শুরুতেই দুটো দলে বিভক্ত হবে। একটি দল স্টাডি গ্রুপ, যাদের মস্তিষ্কের ধমনীতে আঘাত দেওয়া হবে আর আরেকটি দল সেই আঘাতের অংশটুকু ছাড়া বাকি সবকিছুর অভিজ্ঞতা পাবে। অনেকটা যেন প্রেম হয়ে গেছে, কিন্তু হৃদয় ভাঙেনি এমন একটা ব্যাপার; সত্যি বলতে এই দ্বিতীয় গ্রুপটির কী হয় তা জানতেই বেশি আগ্রহ লাগছে আমার।

মোহনের ফোঁড়ন কাটা জারি রয়েছে—শর্ট লিস্ট হলো? রামিনা এসব গানের কিছু কি বুঝবে? 

সত্যি বলতে আমিও কিছুটা হতোদ্যম। কিন্তু লাঞ্চব্রেকের সময় সংক্ষিপ্ত তালিকাটি পেলাম। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা গানের পাশে তারকাচিহ্ন বসানো। অথচ রামিনার সাবকনশাস বায়াস এড়াতে গীতিকার আর শিল্পীর নাম সরিয়ে দিয়েছিলাম।

এবার কেবল এই গানগুলো ওদের শোনানোর পালা। আমার কৌতূহল দ্বিতীয় গ্রুপটিকে নিয়ে, প্রোটোকলে যাকে বলা হয়েছে শ্যাম (Sham), আমার ভাষ্যে তাদের প্রেম হয়েছে কিন্তু হৃদয় ভাঙেনি। মোহন সেই শুরুর দিন থেকে বলে এসেছে—‘এই  Sham কিন্তু সেই শ্যাম নয়, তাই স্টাডি গ্রুপকে আবার রাধা বানিয়ে দিয়ো না!’

মোহনকে আর বলা হয় না তাদের নাম রেখেছি ‘দুখজাগানিয়া’। অবশ্য আমি এখন অন্ধ, কোন ইঁদুরটি যে শ্যাম আর কোনটি দুখজাগানিয়া তা আর জানি না। রামিনার মতে এই অন্ধত্ব আমাকে বায়াস থেকে বাঁচাবে। দু’দিন হলো ওর শর্টলিস্ট থেকে ক্রমাগত গান বেজে চলেছে আর আমি সেই প্রাণীগুলোর ছুটোছুটি রেকর্ড করে চলেছি, পুরো সাত দিন এমন চলবে।

প্রথম দু’দিন কিছুই চোখে পড়ল না। তৃতীয় দিন মনে হলো কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। গানের নির্দিষ্ট কয়েকটা লাইন বাজতেই কেউ কেউ বাক্সের ঠিক মাঝখানে এসে বেশ খানিকটা সময় স্থির থাকছে, লেজ ঘুরিয়ে মুখের কাছে এনে ঘষছে, অযথা ভয় পেয়ে দেয়াল ঘেঁষে থাকছে না। মোহন মাঝেমধ্যে এসে ‘এ জন্মে কিচ্ছু হবে না তোমার’ ভঙ্গিতে একবার উঁকি দিয়ে যায়। আর রামিনার মতে ডেটা অ্যানালাইসিস না হওয়া অবধি কিছু অনুমান করতে চাওয়া কিংবা হাইপোথিসিস নিয়ে অতি আত্মবিশ্বাস মানেই বোকামি। 

সুপারভাইজারের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণে ওর সঙ্গে আবার দেখা হলো। বিয়ারের বোতল ঠুকে চিয়ার্স করছে সবাই। আমার চোখ আটকে আছে একজনের ওপরে। একটা প্রগাঢ় নীল রঙের গাউন পরে এসেছে সে, চোখমুখে প্রসাধনীর হালকা প্রলেপ। রোজ যেমন দেখি, একটু এলোমেলো চুল, সাদা ল্যাবকোট, মাস্কে ঢাকা মুখ আর টানাটানা দুটো চোখ; তার চেয়ে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে রামিনাকে।

এসবের মাঝে গাঁকগাঁক করে বাজতে থাকা গানটাই শুধু বেমানান। আমার ইঁদুরগুলো হয়তো এ গান শুনলে ঘটনাস্থলেই মারা পড়বে; কিংবা মোহনের যুক্তি সঠিক হলে হয়তো এ গানই বেশি কার্যকর হবে। তবে আমার অনুমান বলছে যারা রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছে আর যারা তার বদলে শুনেছে অখ্যাত কারও গান, নিশ্চয়ই বেশ একটা পার্থক্য থাকবে দু’দলের আচরণের মধ্যে। 

ফেরার সময় রামিনার পা টলছিল। গাড়িতে উঠে বসতেই একেবারে চুপচাপ, ভেবেছি হয়তো এখুনিই ঘুমিয়ে পড়বে। নিচু ভলিউমে গান ছেড়ে দিয়ে শিস দিতে দিতেই পাশ থেকে গুনগুন শুনতে পেলাম।

এ গান তোমার অত ভালো লাগল?

আমার প্রশ্নে রামিনা মাথা দোলায়—কেন যেন গুজবাম্পস হচ্ছে এখন, অথচ সেদিনও তো এ গানটা শুনলাম!

আমারও হয়, মাঝে মাঝে শরীরে এমন কদম ফোটে। রামিনা কি কদমফুল দেখেছে কখনো? ওর দেশে কি এ ফুল ফোটে? মুখে বললাম—নিশ্চয়ই এর একটা কারণ আছে নয়তো স্টার কেন দিয়েছিলে?

‘ওগো দুখজাগানিয়া’র অ্যাকুয়েস্টিক প্রোফাইল অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা, এই স্টাডির জন্য স্টিমুলাস হিসেবে ভালো; এ ছাড়া আর অন্য কিছু তো মনে হয়নি!

রামিনার কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। একটু থেমে সে আবার বলল—তুমি কি ভেবেছ, আহমেদ? আমার পছন্দ বলে ওভাবে মার্ক করেছিলাম? 

কিছু বলার মতো খুঁজে না পেয়ে গানের ভলিউম খানিক বাড়িয়ে দিলাম। ইউক্যালিপটাস চোখ দুটো তখনো তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি মাথা নেড়ে না বললাম; আগাগোড়া বিজ্ঞানী এই মেয়েটিকে আমার মিথ্যে বলতে ইচ্ছে হলো।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত