সেলুলয়েডের ফিতায় ৬ অমর সিনেমা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ এএম

সিনেমার পর্দায় আলোর ঝিলিক আর সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি মুহূর্তগুলো মাঝেমধ্যে হয়ে ওঠে একটি জাতির আবেগ, অনুভূতির আর ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। বাংলা সিনেমার ইতিহাস তেমনই এক মহাকাব্যিক গল্পগাথা, যা সামাজিক প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে স্পর্শ করেছে হৃদয়ের গভীরে। বাংলাদেশের সিনেমায় এসেছে রূপান্তরের নানা বাঁক। জহির রায়হান, সত্যজিৎ রায়, আতাউর রহমান, সুভাষ দত্তের ক্যামেরা-কলমে উঠে এসেছে বাংলার মাটি, মুক্তি সংগ্রাম ও মেহনতি মানুষের চিরন্তন জীবনের গল্প। স্বাধীনতার পর থরে থরে সিনেমা সমৃদ্ধ করেছে ঢালিউডের ঝুলি, যা আজও দর্শক হৃদয়ে অমর।

বর্তমানের মারকাটারি আর ভায়োলেন্স ভরা সিনেমার প্রাধান্যের পরও বাংলা সিনেমার সেই স্বর্ণালি অধ্যায় এবং রুপালি পর্দার সেই কালজয়ী গল্পগুলো যুগের পর যুগ পেরিয়ে সমান উজ্জ্বল ও অমলিন। এ রকম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অমর সিনেমা নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন কাজী মাহেরা

ওরা ১১ জন (১৯৭২)

মহান স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা। চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় নির্মিত সিনেমাটির বেশ কজন অভিনেতা ছিলেন যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা, যা সিনেমাটিকে এক জীবন্ত দলিলে পরিণত করেছে। এর মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ১১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কেন্দ্র করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন নারী সমাজের ভূমিকার পাশাপাশি তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতাও এতে স্থান পেয়েছে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেন খসরু, মুরাদ, হেলাল ও নান্টু; যারা ছিলেন যুদ্ধের অগ্রসেনানী। এ ছাড়াও অভিনয় করেন রাজ্জাক, শাবানা, নূতন, সৈয়দ হাসান ইমাম, বেবী জামান, খলিলউল্লাহ খানসহ অনেকে।

সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কালজয়ী ‘সীমানা পেরিয়ে’ পরিচালনা করেন চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির। সত্তরের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ঘটনাবলি নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি বাঙালির হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। এতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির, মায়া হাজারিকা, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। উপকূলবর্তী অঞ্চলের সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তা-বলীলায় মানুষ ও জীবজন্তু ভেসে যায় সমুদ্রের পানিতে। তিন মাস পর দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে কোনো রকমে বেঁচে থাকতে দেখা যায় একজোড়া মানব-মানবীকে। তাদের সেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি চারটি জাতীয় পুরস্কার পায়।

অশিক্ষিত (১৯৭৮)

‘ডাক্তার সাব আমি নাম-দস্তখত শিখতে চাই’ ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অশিক্ষিত’ সিনেমার এই গানটি অমর হয়ে আছে। অশিক্ষিত গ্রামের চৌকিদার রহমতকে লেখাপড়া শেখায় গ্রামের দরিদ্র অনাথ বালক মানিক। দুর্নীতিবাজ আড়তদারের অপরাধ দেখে ফেলায় খুন হয় মানিক। তার খুনের সাক্ষী হয় রহমত এবং তার সাক্ষ্যে শাস্তি হয় অপরাধীর। সাক্ষীর দরখাস্তে নিজ হাতে নাম সই করে রহমত। এ রকম এক হৃদয় নিংড়ানো কাহিনি লিখেছেন সত্য সাহা। আজিজুর রহমানের পরিচালনায় সিনেমাটিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক, অঞ্জনা রহমান, সুমন, রোজী সামাদ, এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ। ছবিটি বাণিজ্যিক সফলতার পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়ায়।

সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯)

বিশিষ্ট গ্রন্থকার আবু ইসহাকের ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত কালজয়ী (উপন্যাস) ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি বাংলাদেশের প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। কুসংস্কার, ধর্ম, প্রতিপত্তি, সামাজিক বাধানিষেধ, জাতীয়তাবোধ এসব কিছুকে কাজে লাগিয়ে শ্রমজীবী ক্ষুধার্ত মানুষকে ক্রমাগত শোষণের এক হৃদয়বিদারক কাহিনি উঠে এসেছে এতে। অভিনয় করেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, জহিরুল হক, কেরামত মাওলা, এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ।

ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০)

ঈদের ছুটি ঘোষণার দিন স্কুলের বাথরুমে সবার অজান্তে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়ে ১২ বছর বয়সের এক ছাত্র। তালাবদ্ধ সেই বাথরুমে দীর্ঘ ছুটি শেষ হওয়ার প্রতীক্ষা আর মুক্তির কল্পনায় ১০ দিন অমানবিক কষ্ট সহ্য করার পর নিষ্পাপ কচি মুখটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই দিনগুলোয় হৃদয়বিদারক নানা ঘটনা ও করুণ দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে সিনেমাটিতে। এতে অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী সুমন, রাজ্জাক, শাবানা, সুজাতা, শওকত আকবর ও এটিএম শামসুজ্জামান। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শিশুতোষ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন আজিজুর রহমান।

ভাত দে (১৯৮৪)

১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভাত দে’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ নয়টি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। নাট্যধর্মী সিনেমাটির সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন আমজাদ হোসেন। জরি একজন গরিব বাউল শিল্পীর মেয়ে। যে কিনা ছোটবেলায় অভাবের কারণে মাকে হারায়, অন্ধ বাউল বাবাকে নিয়ে ছোটবেলা থেকে যার সংগ্রামী ও অতি অভাব-অনটনের সংসার। অসহায় দরিদ্র ‘জরি’র অতি করুণ কাহিনির একটি সফল চিত্ররূপ ‘ভাত দে’ সিনেমা। এতে অভিনয় করেছেন শাবানা, আলমগীর, রাজীব, আনোয়ার হোসেন ও শিশুশিল্পী হিসেবে আঁখি আলমগীর।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত