ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে শিক্ষার্থীদের জেন-জি আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বৈষম্যের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেতে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান ও কৌশলেও দেখা যাচ্ছে নতুন মেরুকরণ।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে প্যারিসের উপকণ্ঠে শুরু হওয়া বিক্ষোভ অক্টোবরের প্রথমার্ধে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, ইউনিয়ন প্রতিনিধি ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরাও অংশ নেন। বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শিক্ষকস্বল্পতা, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন, অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ এবং শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য তাঁদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা মঁদে ৫ অক্টোবরের এক বিশ্লেষণে আন্দোলনটিকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী আন্দোলনগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে, দ্য গার্ডিয়ানের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু আন্দোলনের পরিচিত মুখ গ্রেটা থুনবার্গও প্যারিসের উপকণ্ঠে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। এতে আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে।
আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষার মান, সমান সুযোগ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য বাড়ছে। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অনুপযুক্ত। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রতিযোগিতা ও পছন্দের বিষয়ে পড়ার অনিশ্চয়তাও তাঁদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা তাঁদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, বিক্ষোভের ছবি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা দ্রুত জাতীয় আলোচনায় উঠে আসছে।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নন। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সমান সুযোগ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাঁদের অভিন্ন দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান।
২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। ১১ অক্টোবর ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব দেন।
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রচলিত ব্যবস্থারও বিরোধিতা করেছেন মেলঁশোঁ। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ আরও সমতাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। তাঁর দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানালেও বিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলঁশোঁর নির্বাচনী কৌশলে তরুণদের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন শেষ পর্যন্ত তাঁর নির্বাচনী সম্ভাবনা কতটা বাড়াবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মেরিন ল্য পেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। জনসম্পত্তি রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিদ্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় মেরামতের ব্যয় অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছেন ল্য পেন।
এই অবস্থানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে আইনশৃঙ্খলা ও জনসম্পত্তি রক্ষার পক্ষে দৃঢ় নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তবে শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাগত বৈষম্যের মতো সমস্যার সমাধানে তাঁর রাজনৈতিক শিবির কী পরিকল্পনা দেয়, সেটিও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের নির্বাচনে ল্য পেনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তাঁর চলমান আইনি পরিস্থিতির ওপরও নির্ভরশীল।
মধ্যপন্থী রাজনীতিক গ্যাব্রিয়েল আত্তাল শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মেলঁশোঁর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। লা মঁদে ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে মেলঁশোঁকে মোকাবিলায় নিজের প্রচার জোরদার করছেন আত্তাল।
তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণদের অসন্তোষের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকারের নীতির সঙ্গে নিজের অবস্থানের পার্থক্য তুলে ধরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপও মধ্য-ডানপন্থী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী। শিক্ষার্থী আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা এবং শিক্ষানীতি নিয়ে তাঁর অবস্থান নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, সমাজতান্ত্রিক ও সংশ্লিষ্ট বামপন্থী ভোটারদের প্রাথমিক নির্বাচনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য রাফায়েল গ্লুকসম্যানকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে তরুণদের সমর্থন আদায়ের প্রতিযোগিতা বাম ও ডানপন্থী শিবিরের পাশাপাশি মধ্যপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
শিক্ষার্থী আন্দোলনের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের বরাতে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, প্যারিসসহ ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে ১১০টির বেশি বিদ্যালয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৫ লাখ ইউরো। প্রায় ১২০টি প্রবেশপথ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের মূল সরকারি নথি প্রকাশের আগে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ, আটক এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ছয় হাজার আট শতাধিক ব্যক্তিকে আটক এবং শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীর আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। সময় ও সংজ্ঞাভেদে এসব সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় সরকার তিন হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশের মতে, সাময়িক নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ।
ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২৭ সালের বসন্তে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ টানা তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জেন-জি আন্দোলন নির্বাচনী রাজনীতিতে কয়েকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণদের কর্মসংস্থান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী কর্মসূচিতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে। আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো দলগুলো তরুণ ভোটারদের সংগঠিত করার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের কারণে আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলোও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানেই নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়া নয়। ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রার্থীর কর্মসূচি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারি সেবার মানও প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণদের মধ্যে ভোটদানে অনাগ্রহ থাকলে বড় আন্দোলনও নির্বাচনী ফলাফলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হতে পারে।
ফ্রান্সের জেন-জি আন্দোলন এখন সরকারের জন্য একই সঙ্গে শিক্ষানীতি ও আইনশৃঙ্খলার পরীক্ষা। একদিকে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভাঙচুর বন্ধ করা জরুরি, অন্যদিকে শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাগত বৈষম্যের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানও প্রয়োজন।
২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে মেলঁশোঁ, ল্য পেন, আত্তাল ও ফিলিপের মতো নেতারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। কিন্তু তরুণদের আস্থা অর্জনে শুধু আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে বক্তব্য যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি, অর্থায়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের জেন-জি আন্দোলন কেবল বিদ্যালয়ের সংকটের প্রতিবাদ নয়; এটি শিক্ষানীতি, সামাজিক বৈষম্য ও আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন। ২০২৭ সালের নির্বাচনে এই আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে তরুণদের দাবিগুলো কতটা কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নেয় এবং তরুণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে কতটা সক্রিয় হন, তার ওপর।