ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় টাইপরাইটার বিলুপ্তির পথে

জনপ্রিয় টাইপরাইটার আজ পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে। জেলা-উপজেলা, শহরের পর শহর ঘুরেও টাইপরাইটারের সেই চিরচেনা খটখট শব্দ আর শুনা যায় না।

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

আমাদের দেশে এক সময় আদালত প্রাঙ্গণ, সরকারি, আধা সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজসহ সর্বত্র লেখালেখির জন্য অতি প্রয়োজনীয় এক যন্ত্র ছিল ‘টাইপরাইটার’। কম্পিউটার নামক যন্ত্রটি আবিস্কারের আগ পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে এই টাইপরাইটার নামক যন্ত্রটিই ছিল আমাদের নিত্য দিনের অনুষঙ্গ। সময়ের বিবর্তনে, ডিজিলাইটেশনের প্রভাবে এবং লেখালেখির উন্নত প্রযুক্তি কম্পিউটার আবিস্কারের পর থেকে একেবারে কমে গেছে এক সময়ের বহুল প্রচলিত, ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় টাইপরাইটারের কদর।

জনপ্রিয় টাইপরাইটার আজ পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে। জেলা-উপজেলা, শহরের পর শহর ঘুরেও টাইপরাইটারের সেই চিরচেনা খটখট শব্দ আর শুনা যায় না।

জানা যায়, ১৮৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস টাইপরাইটার আবিষ্কার করেছিলেন। এর পাঁচ বছর পর ১৮৭৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে টাইপরাইটার বাজারে আসে। এটির প্রথম বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান হলো মার্কিন কোম্পানি র‍্যামিংজটোন অ্যান্ড সন্স। ১৮৯০ সালে ব্রিটিশরা ভারতে টাইপ রাইটার নিয়ে এসেছিল। পরে দেশীয় কোম্পানিগুলো টাইপরাইটার তৈরি শুরু করে এবং আদালত প্রাঙ্গণ, সরকারি, আধা সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজসহ নানা স্থানে এটির ব্যবহার হয়। সেই থেকে ১৯৮০ দশক পর্যন্ত টাইপরাইটারের একচ্ছত্র রাজস্ব অব্যাহত ছিল।

মৌলভীবাজার আদালতের পাশে নিজের টাইপরাইটার নিয়ে মামলার আর্জিসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন কনকপুর ইউনিয়নের অজিত দাশ। বর্তমানে বয়সের ভাড়ে ন্যুজ অজিত দাশ বলেন, স্বাধীনতার আগ থেকেই আদালতের পাশে ছোট একটি টেবিল ও টুলে বসে নিজের টাইপরাইটার দিয়ে কাজ করতেন। এখনকার চেয়ে আমাদের সময় আদালতে মামলা-মোকদ্দমা অনেক কম ছিল। তারপরও প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দৈনিক কমপক্ষে ১৫-২০টি মামলার আর্জি, এফিডেভিট, ক্রয়-বিক্রয় রশিদ, চুক্তিনামাসহ নানা কিছুর কাজ করেছি। আমাদের পরিবারের একটি টাইপরাইটারই ছিল জীবিকার একমাত্র উৎস। মামলার আর্জি লিখতে লিখতে আমি এতোই অভিজ্ঞ হয়ে যাই যে, অনেক সময় জুনিয়র আইনজীবীরা বাদী পক্ষকে আমার কাছে পাঠাতেন যেন গুছিয়ে মামলার আর্জি লিখে দেই।

তিনি জানান, প্রথম যখন আমি টাইপরাইটার নিয়ে কাজ শুরু করি তখন আর মাত্র একজন ছিলেন। তিনি এবং আমি দুইজনেই কাজ করেছি দীর্ঘদিন। পরে জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, বেড়েছে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন। সেই সাথে আদালতের পাশে বেড়েছে টাইপরাইটার ও টাইপিস্টদের সংখ্যা। সরকারি প্রায় অফিসগুলোতে টাইপরাইটার ছিল নিত্য দিনের কাজের অংশ। এসব টাইপরাইটারের জন্য অফিসগুলোতে চাকরিরত ছিলেন সাট মুদ্রাক্ষারিক। এখনো অফিসগুলোতে সাট মুদ্রাক্ষারিকরা আছেন, তবে নেই ঐতিহ্যবাহী টাইপরাইটার। প্রতিটি অফিস-আদালতে টাইপরাইটারের পরিবর্তে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক লেখনি যন্ত্র কম্পিউটার।

মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ নামের একটি আগর-আতর কোম্পানিতে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্য একটি টাইপরাইটার। তবে এই টাইপরাইটার দিয়ে কোন কাজ করা হয় না। শুধুমাত্র আবহমান কালের স্মৃতি হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠান টাইপরাইটি ‘সোপিস’ হিসেবে খুবই যত্নে সংরক্ষণে রেখেছে।

এ বিষয়ে ‘আগর ফ্রেগরেন্স’র সাথে সংযুক্ত শামীম আক্তার হোসেন বলেন, 'আমাদের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু সব সময় প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি একটি টাইপরাইটার মেশিন খুবই যত্নের সাথে সংরক্ষণে রেখেছেন। মৌলভীবাজারে আমাদের ‘আগর ফ্রেগরেন্স’ কার্যালয়ে রাখা এই টাইপরাইটারটি দেখতে একেবারে নতুনের মতো চকচকে। নব-প্রজন্মের অনেকে এটি দেখে পুলকিত হন। আর প্রবীণরা টাইপরাইটি দেখে অতীতের স্মৃতিচারণ করে থাকেন। যারা আগর ফ্রেগরেন্স কার্যালয়ে আসেন তারা তাদের মুঠোফোনে প্রাচীন যন্ত্র টাইপরাইটারটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নেন।'

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত