পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, সিসা দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। সিসা দূষণ প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিসা দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকার অনুমোদিত ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২০৩৫’ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীজনদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বুধবার (১৪অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা: সমাধানের সম্প্রসারণ ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পিওর আর্থ বাংলাদেশ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল ও বহুবর্ষমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২০৩৫’ অনুমোদন করেছে। এ কর্মপরিকল্পনায় সিসা দূষণের উৎস শনাক্তকরণ, পরিবেশগত নজরদারি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন ও বিধিবিধান শক্তিশালীকরণ, শিল্প খাতের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় কৌশল অনুমোদনের পর এখন এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দূষিত এলাকা পুনর্বাসন, নিরাপদ শিল্পব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি শিল্পে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা বা এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাটারি উৎপাদক, আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব নির্ধারণ, ব্যবহৃত ব্যাটারি নিরাপদে সংগ্রহ এবং পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচলিত পরিবেশ আইন ও বিধিবিধান প্রতিপালন এবং শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তরুণদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, সিসা দূষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী সমাধান বাস্তবায়নে তরুণ সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিতে হবে। তিনি সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে তরুণদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
সেমিনারে সিসা দূষণ প্রতিরোধে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশের জন্য জাতীয় যুব জোট’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এ ছাড়া সিসা দূষণ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমাধান উদ্ভাবনে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিসা দূষণ শনাক্তকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি বহনযোগ্য এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স (এক্সআরএফ) বিশ্লেষণযন্ত্র হস্তান্তর করা হয়।
সেমিনারে পিওর আর্থ বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আফতাব উজ জামান খান সিসামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন, পিওর আর্থের কার্যক্রম এবং খুলনার লবণচরা এলাকায় সিসা দূষণ প্রতিকার কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী শেখ সাজিদুল ইসলাম ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও ফেরতব্যবস্থা বিষয়ে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ উপস্থাপন করেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, তরুণ প্রতিনিধি, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা।