‘২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ এএম

২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নিতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রাম এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।

মন্ত্রী বলেন, জাতীয় ও বৈশ্বিক অঙ্গীকার অনুযায়ী হেলমেটের মান হালনাগাদ, গতিসীমা কার্যকর ও এ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আন্ডারপাস নির্মাণ, মহাসড়কে বাম পাশের লেন তৈরির প্রকল্প গ্রহণ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপার নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ‘বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের অঙ্গীকার, সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা ছিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও জাতীয় পরিকল্পনার আলোকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়।

শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকার ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করলেও সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না। জাতি হিসেবে নিজেদের নিরাপদ না রাখার প্রবণতা অন্যদেরও অনিরাপদ করে তুলছে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে শুধু নির্দিষ্ট দিবসকে কেন্দ্র করে নয়, সারা বছর কাজ করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, দেশের প্রচলিত সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার কারণে জাতিগতভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এবং এ জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে বিদ্যমান মাফিয়াতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকেরা একসঙ্গে কাজ করলে দ্রুত পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে, যা এবারের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বেতন-ভাতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত ও সূচনা বক্তব্য দেন ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের পরিচালক আহমেদ নাজমুল হুসেইন। পরে একই কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার এম খালিদ মাহমুদ পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সরকারের অঙ্গীকার, সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নসহ নীতিগতভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এমন বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

গোলটেবিল বৈঠকের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতবিনিময় হয়।

আলোচনায় নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, কার্যকর গতিসীমা ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ যানবাহন, সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা ও চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অংশগ্রহণকারীরা নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা বা ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন। এ পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সড়ক ব্যবহারকারীদের নয়; বরং নীতিনির্ধারক, সড়ক কর্তৃপক্ষ, পরিবহন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।

বৈঠকে রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশের সড়কব্যবস্থাকে সবার জন্য নিরাপদ করতে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নসহ সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপের মধ্য দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকটি শেষ হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত