ফেনীর ৬২ কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০২ এএম

প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ফেনীর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ওষুধের অপ্রতুলতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপিদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিগত সময়ে এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারি করা হলেও বর্তমানে এ সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সেবাপ্রার্থীরা। এ ছাড়া ক্লিনিকগুলোতে সিএইচসিপির ১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এদিকে জেলায় ৬২টি ক্লিনিক ভবন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

জানা যায়, ফেনী জেলায় মোট ১৫১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে জেলা সদরে ৩৭টি, সোনাগাজীতে ১৪টি, ছাগলনাইয়ায় ৫টি, দাগনভূঞায় ১টি, পরশুরামে ২টি ও ফুলগাজীতে ৩টিসহ মোট ৬২টি ক্লিনিক ভবন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ। বাকিগুলো মোটামুটি ভালো অবস্থায় রয়েছে। সদর উপজেলায় ধর্মপুর, ছনুয়া, কাজিরবাগ, কালিদহ, ফাজিলপুর ও পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি ক্লিনিক জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়াও সোনাগাজীর বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থায় একেবারেই বেহালদশা।

প্রান্তিক মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১৯৯৯ সালে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হলেও ২০০১ সালে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ২০০৮ সালে তা পুনরায় চালু করা হয়। এরপর দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মূলত পিপিপির মাধ্যমে এসব কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার বা কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী থাকার (সিএইচসিপি) কথা। তারা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এবং গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করেন। বিশেষ করে, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মূলত মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়। তবে অবহেলা, অনিয়ম আর জরাজীর্ণ ভবনের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেবা নিতে আসা একজন রোগী জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনগুলো জরাজীর্ণ থাকায় এবং সিএইচসিপিরা অনিয়মিত থাকায় নিয়মিত সেবা পাই না।

সোনাগাজী উপজেলার বেশ ক’টি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জানান, দীর্ঘদিন ক্লিনিকের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ছাদ থেকে পানি পড়ে, প্রায়ই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। নানা প্রতিকূলতা নিয়েও প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন মা ও শিশুকে সেবা দিতে হয়। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়।

সিএইচসিপিদের তথ্যমতে, প্রতি মাসে ২৪ প্রকার মেডিসিন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পেয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে নাপা, অ্যান্টাসিড, কৃমিনাশক, পাপায়া (কোষ্ঠকাঠিন্য), সালবুটামল (হাঁপানি ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), ভিটামিন, খাবার স্যালাইন, জিংক সিরাপ। এছাড়া বাচ্চাদের কিছু রোগের সিরাপ। তবে সেবাপ্রত্যাশী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ খুবই কম। বিগত সময় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সরবরাহ করা হলেও তা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

সদর উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত বেশ কয়েকজন হেল্থ কেয়ার প্রোভাইডার জানান, ক্লিনিকে ২৪ প্রকারের ওষুধ দেওয়া হয়। দুই মাসের জন্য সেগুলো দেওয়া হলেও তা মানুষের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ জন্য ১ম মাসের শুরুতেই তা শেষ হয়ে যায়। বিশেষ করে, বাচ্চাদের সর্দি-জ্বর ও পাতলা পায়খানার সিরাপের চাহিদা বেশি থাকলেও তা পরিমাণে কম পাওয়া যায়। বরাদ্দ আরেকটু বাড়ালে আমাদের জন্য ভালো হতো।

মাথিয়ারা কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মেছবাহ জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন মা ও শিশুকে সেবা প্রদান করে থাকেন। ক্লিনিকের পুরনো ভবনটি কয়েক মাস আগে মেরামত করা হলেও পুরোপুরি সমস্যা সমাধান হয়নি। বিরলী কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার রুমা আক্তার জানান, বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে সেবার মান ও গতি বেড়েছে। এখানে নিয়মিত রোগীরা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন।

সিভিল সার্জন ডা. মো আরিফুজ্জামান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটি ক্লিনিকের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সিএইচসিপির ১৮টি পদ শূন্য থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া ঢাকা অফিস থেকে হয়ে থাকে, আমরা অধিদপ্তরকে চাহিদা জানিয়েছি। শিগগিরই তা সমাধান করা হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত ২৪ প্রকার মেডিসিন সরবরাহ করা হচ্ছে। কোথাও সাময়িক অসুবিধা হলে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত