সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো সত্য অনুসন্ধান, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু কোনো সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যদি ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থে আঘাত করে, আর তার পরপরই সেই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির মামলা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন ওঠে—এটি কি অপরাধের বিচার, নাকি সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের চেষ্টা? নওগাঁর আত্রাইয়ে সাংবাদিক সিফাত মাহমুদ ফাহিমের কারাবাসের ঘটনায় সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আত্রাই উপজেলার ২ নম্বর ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজিম উদ্দিন মণ্ডল ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে গত ৩ জুন ২০২৬ তারিখে আদালতে মামলা করেন। মামলায় অভিযুক্ত হন দৈনিক ইনকিলাবের আত্রাই উপজেলা প্রতিনিধি সিফাত মাহমুদ ফাহিম। পরে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ নওগাঁর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর হয় এবং তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামতের বরাদ্দ, সরকারি জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি এবং পরিষদের মালামাল সরানোর অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিক ফাহিমের সঙ্গে চেয়ারম্যানের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের জানালা ভ্যানে করে সরানোর সময় স্থানীয়দের বাধা দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তবে ঘটনাগুলোর সঙ্গে মামলার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সুরক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে, ৩৯ অনুচ্ছেদে যুক্তিসংগত আইনগত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সাংবাদিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না, আবার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তার মৌলিক অধিকার উপেক্ষা করার সুযোগও সৃষ্টি হয় না।
ফৌজদারি কার্যবিধিতে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকলেও তা যথেচ্ছ প্রয়োগের অনুমতি নয়। ২০২৬ সালের সংশোধিত কার্যবিধির ৪৬এ ধারায় গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ, গ্রেপ্তার স্মারক প্রস্তুত এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তারের তথ্য পরিবারের সদস্য বা মনোনীত ব্যক্তিকে জানানোর মতো বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে। একই আইনের ৬৭এ ধারায় আদালতকে গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার কিংবা অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করা সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্বের অংশ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নথিপত্র সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ—এসবই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার শর্ত। কোনো প্রতিবেদনে ভুল থাকলে তার প্রতিবাদ, সংশোধন বা আইনসম্মত প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত বিচারের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
কিন্তু সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ এবং পরবর্তী মামলার মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। মামলাটি প্রতিশোধমূলক কি না, তা নির্ধারণে সংবাদ প্রকাশের সময়, কথিত চাঁদাবাজির ঘটনার তারিখ, যোগাযোগের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সাংবাদিক সিফাত মাহমুদ ফাহিমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে তার আইনজীবীকে মামলার নথি পর্যালোচনা ও আইনসম্মতভাবে জামিনের প্রতিকার চাওয়ার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। আদালতের কাছে জামিনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী বিবেচিত হওয়া উচিত।
আমার দাবি কারও অপরাধ আড়াল করা নয়; বরং অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করা। সাংবাদিক অপরাধ করলে তারও বিচার হবে, জনপ্রতিনিধি অপরাধ করলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পদ, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব যেন কারও জন্য বিশেষ সুবিধা বা অন্য কারও জন্য শাস্তির কারণ না হয়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের কলম যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রয়োগও হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত। সিফাত মাহমুদ ফাহিমের মামলার সত্য উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে নিরপরাধ ব্যক্তি সুরক্ষা পান, অপরাধী শাস্তি পান এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে।
লেখক: তরিকুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]