রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত চান্দিনার সাগর, যা জানা গেল

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১১ পিএম

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মো. সাগর (২৪) রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে খবর পেয়েছে তাঁর পরিবার।

গত শনিবার রাশিয়া থেকে সাগরের এক বন্ধু তাঁর বোনের মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে মৃত্যুর খবর জানান। সেই বার্তা দেখার পরপরই মূর্ছা যান সাগরের মা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের অভাব ঘোচাতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে একটি বেকারিতে কাজও পেয়েছিলেন। তবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি ও এককালীন ৩০ লাখ টাকা পাওয়ার প্রলোভনে পড়ে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

সাগরের মৃত্যুর খবর জানালেও তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা মৃত্যুর বিস্তারিত বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার। রাশিয়ায় থাকা ওই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, গত শনিবার তাঁর বন্ধুর পাঠানো বার্তায় সাগরের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তাঁরা। বন্ধুটি রাতে বিস্তারিত জানাবেন বলেছিলেন। তবে গতকাল রবিবার রাত নয়টা পর্যন্ত তিনি ফোন করেননি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না।

সাগরের পরিবার নিম্নবিত্ত। অভাব-অনটনের কারণে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনো হয়নি তাঁর। কিশোর বয়স থেকেই রিকশা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের আর্থিক জোগান দিতেন। চান্দিনা উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানের পণ্য ভ্যানে বহন করতে গিয়ে দোকানটির এক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

একপর্যায়ে ওই ব্যবস্থাপক চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে যান। পরে দেশে ফিরে আবারও একই দোকানে চাকরি নেন। পুরোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে সাগরকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন তিনি। তাঁর সহযোগিতায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর।

সেখানে একটি বেকারিতে কাজ শুরু করেন। মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতন পেতেন তিনি। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা কাটবে বলে আশা করেছিলেন স্বজনেরা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, রাশিয়ায় কাজ করার সময় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় সাগরের। ওই ব্যক্তি তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। পাশাপাশি এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান। সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে দেন সাগর।

এ বিষয়ে সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, সাগর যখন বেকারির চাকরি ছেড়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কথা জানায়, তখন আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম। কারণ, সে লেখাপড়াই জানে না। বিদেশের সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে? পরে জানতে পারি, দালাল তাকে ভুল বুঝিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে।

আব্দুল আওয়াল আরও বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাগর তাঁর ব্যাংক হিসাবে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। শনিবার বন্ধুর পাঠানো বার্তায় তাঁর মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।

ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েছেন বাবা কবির হোসেন। একসময় সবজির ব্যবসা করলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন তিনি। ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন পরিবারের অভাব দূর হবে—এই আশায়। কবির হোসেন বলেন, সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলেটার সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নাই। এ কথা বলেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

এ বিষয়ে চান্দিনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, সাগরের মৃত্যুর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবেন তিনি।

 

 


সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত