মাদকের ভয়ংকর বিস্তার

চাই সর্বব্যাপী সামাজিক আন্দোলন

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৬ এএম

নিজের এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তার উদ্দেশ্য যাই থাক, বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীসুলভ না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫’ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্টে দেশে মাদকের ভয়ংকর বিস্তারের যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তাতে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে মাদক পাচারের একটি বড় ট্রানজিট রুট ও বাজার বলা হয়েছে। নাগরিকদের বিপুল আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পাশাপাশি বিষয়টি দেশের জন্য বিব্রতকর। মাদকের বড় অংশ আসে ভারত ও মিয়ানমার থেকে। তিন দেশেরই অনেকগুলো চক্র এতে জড়িত। কূটনৈতিক আলোচনায় এ বিষয়ে আপত্তি করা হয়। কিন্তু দেশ দুটি আপত্তিকে গুরুত্ব দেয় না। ইয়াবা, আইস ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে আসা বন্ধের চেষ্টাও এ পর্যন্ত সফল হয়নি। স্থানীয়ভাবে মাদক উৎপাদন-বিক্রির মাধ্যমে অসামাজিক, বেআইনি এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরির কার্যক্রম বন্ধে ফলপ্রসূ কিছু কি আদৌ করা হয়েছে? ব্যক্তির মাদক গ্রহণ বন্ধে পরিবারের চেষ্টার চেয়ে তেমন বেশি কিছু কি হচ্ছে? দুটি প্রশ্ন জনসমাবেশে করা হলে, জবাব সম্ভবত সজোরেই আসবে ‘না’। কেন? কারণ, মাদকের দানবীয় থাবা থেকে স্বজনদের রক্ষার বিষয়ে মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন। পরিবারে একজন মাদকাসক্ত হলে সবাই আর্থিক, মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ে পড়ে। বড় করে বিষয়টি ভাবলে কী দাঁড়ায়? ডিএনসির হিসাবে, দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ কম-বেশি মাদক গ্রহণ করে। জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলে,  ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, নাগরিকদের সাড়ে ৫ শতাংশ মারণনেশার শিকার, যাদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী, ছাত্র-ছাত্রী ও যুবসমাজের অংশ। সব মিলিয়ে ভয়ংকর এক বিপর্যয়ের দিকে চলেছে মানুষ, সমাজ এবং দেশ।

শৈশব থেকে মাদক গ্রহণে ক্ষতির বিষয়ে ব্যক্তিকে সচেতন করার দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের। কেউ মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তাকে রক্ষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের একক চেষ্টায় সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে মাদকবিরোধী যেসব অভিযান, শোভাযাত্রা-সেমিনার ও দিবস উদযাপন হয়, তাও যথেষ্ট বিবেচিত হচ্ছে না। কেন হয় না? মাদকের কারবারে কারা জড়িতÑ এ প্রশ্নের জবাবেই লুকিয়ে আছে প্রশ্নটির জবাব। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ে গডফাদার, চোরাকারবারি, স্থানীয় গ্যাং হাজার হাজার কোটি টাকার এ কারবারে জড়িত। অবৈধ এ ব্যবসায় লেনদেনের সঠিক তথ্যও মেলে না। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে, দেশে মাদকের লেনদেন ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এর বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়। মাদকের কারবার এত ব্যাপক যে, পরিবহনে স্থল, জল, রেল ও আকাশপথ ব্যবহৃত হয়। দেশে কমপক্ষে ২৩ হাজার ব্যক্তি এ কারবারে জড়িত। অনেক নারী-শিশু খুচরা পর্যায়ে বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নগদ অর্থ ছাড়াও অনলাইন, সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে আর্থিক লেনদেন হয়। তারা বিভিন্ন পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের অসাধু সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের ভেতরও মাদকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন; তবে তা কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নয়।

আমরা মনে করি, মাদক প্রতিরোধ শুধু সরকারি চেষ্টায়, কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী আন্দোলনÑ যাতে প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সম্পৃক্ত হতে হবে, নিজ দায়িত্বে। ইশরাক হোসেন নিজের এলাকায় মাদক প্রতিরোধের কথা বলছেন। স্থানীয় পর্যায়ে সব সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন হবে। আর সবকিছু একসুতোয় বেঁধে আন্দোলন  সফল করতে নেতৃত্ব দিতে হবে সরকারকে। আমাদের পারতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত