এলএনজি আমদানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পরিত্যক্ত সাঙ্গু

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

গ্যাস আমদানির অবকাঠামো সংকটের মধ্যে বিকল্প হতে পারে পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গুর প্ল্যাটফর্ম। সাগরের মধ্যে নতুন পাইপলাইন স্থাপন না করে পড়ে থাকা পাইপলাইনটি ব্যবহার করলে সময় ও ব্যয় দুটোই বাঁচতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার এলএনজি আমদানি করে এই সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে। এখন এলএনজি থেকে দেশে দৈনিক সরবরাহ করা হয় গড়ে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু একটির বেশি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে পৃথক পাইপলাইনও নির্মাণ করতে হবে।

মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে গ্যাস গ্রিড রয়েছে সেখান দিয়ে এখন এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা হলে এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। এর চাইতে বেশি গ্যাস আমদানি করতে হলেই নতুন পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সাগর এবং স্থলভাগ দুই জায়গায়ই নতুন পাইপলাইন স্থাপন করা ছাড়া গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হবে না।

কিন্তু এর বিকল্প হতে পারে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের পাইপলাইনটি। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সাঙ্গু প্ল্যাটফর্মটির অবস্থান চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সমুদ্রবক্ষে। সেখানে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় ১২ মিটার। গ্যাসক্ষেত্রটির প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রসেস প্ল্যান্ট পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন রয়েছে।

কেয়ার্ন এনার্জি সাঙ্গু ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ করার জন্য ১৯৯৬ সালে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটি নির্মাণ করে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নির্মাণ করা সাব-সি পাইপলাইনটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করলে নতুন করে এলএনজি আমদানি করতে আর পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব। সাঙ্গুর প্ল্যাটফর্মটি সাগরের ৫০ কিলোমিটার ভেতরে হওয়ায় এখানে এলএনজির বড় জাহাজ ভেড়ানো কঠিন নয় বলে মনে করা হয়।

কেয়ার্ন এনার্জি ১৯৯৬ সালে সাঙ্গু ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া সাগরের একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গুতে মোট ১১টি কূপ খনন করে এবং ওই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে। ২০১০ সালে কেয়ার্ন এনার্জি গ্যাসক্ষেত্রটির স্বত্ব অস্ট্রেলীয় কোম্পানি সান্তোসের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১৩ সালে বাণিজ্যিক উত্তোলনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসক্ষেত্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, মহেশখালী-আনোয়ারা-ফৌজদারহাট রুটে এখন এলএনজি সরবরাহ করার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন রয়েছে। এই দুটি পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৯১ কিলোমিটার এবং ৭৯ কিলোমিটার। এর বাইরে দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আরও একটি ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালী থেকে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে আরও ৭ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব পাইপলাইন নির্মাণ করতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। নতুন করে পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলে আবার বিপুল পরিমাণ খরচ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের বিদ্যমান স্থাপনাকে কাজে লাগিয়েই এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তাদের যুক্তি, এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে তরল গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য এফএসআরইউতে যে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে তা অন্য ধরনের টার্মিনালেও স্থাপন করা সম্ভব। ফলে সাঙ্গুর বিদ্যমান টার্মিনালকে এ কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। বিশেষ করে, গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে থেকেই সাঙ্গু প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নতুন করে সব স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উপযোগী করে তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা গেলে এসব অবকাঠামোর সমন্বয়ে সাঙ্গুকে এলএনজি গ্রহণ ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের একটি বিকল্প কেন্দ্রে রূপ দেওয়া সম্ভব।

সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে এলএনজি সরবরাহের অন্যতম বড় সুবিধা হতে পারে বছরজুড়ে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের সুযোগ। এর অন্যতম কারণ, অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের ‘শেল্টার্ড সি’ হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের সামুদ্রিক অঞ্চল তুলনামূলকভাবে প্রবল বায়ুপ্রবাহ, উঁচু ঢেউ ও তীব্র সামুদ্রিক স্রোতের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে।

এ কারণে সাঙ্গু অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা গেলে বড় এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল ও টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনায় তুলনামূলক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়া ও সামুদ্রিক দুর্যোগের কারণে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। অন্যদিকে, মহেশখালী ও পায়রা অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল এবং টার্মিনালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এলএনজি জাহাজ ভিড়তে না পারায় কয়েক দফা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়।

তবে সাঙ্গু অঞ্চলে বছরজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, তা নির্ধারণে ওই এলাকার সমুদ্রবিজ্ঞান, আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, নৌযান চলাচলের উপযোগিতা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।

সরকারের পরিকল্পনা বলছে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের পর এলএনজির ব্যবহার বহুলাংশে বাড়বে। তাই এক্ষেত্রে অবশ্যকরণীয় হলো এলএনজি আমদানির অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে জলবায়ু ও দুর্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া এবং টেকসই প্রযুক্তি বাছাই করা।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, সাঙ্গু প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এলএনজি আনা হবে কি না এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। পেট্রোবাংলাকে সরকার বললেই আমরা এই ব্যবস্থা করতে পারি। সাঙ্গুতে পাইপলাইন রয়েছে এটা সবাই জানে। এটা পেট্রোবাংলার তরফ থেকে সরকারকে জানানোর কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, পুরনো যেসব অবকাঠামো রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করা যায় কি না তা আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত। কিন্তু নতুন প্রজেক্ট করলেই কারও কারও লাভ হয়। এ জন্য পুরনো জিনিস ফেলেই রাখা হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত