হলুদ বরণী ফুল

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

‘হলুদ বাঁটিছে হলুদ বরণী মেয়ে,

হলুদের পাটা হাসিয়া গড়ায় রাঙা অনুরাগে নেয়ে।

দুই হাতে ধরি কঠিন পুতারে ঘসিছে পাটার পরে,

কাঁচের চুড়ী যে রিনিক ঝিনিক নাচিছে খুশীর ভরে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (হলুদ বরণী মেয়ে)

বাংলা সাহিত্যে দেখি হলুদের মাখামাখি। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় হলুদ এসেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা লোকজ উৎসবে, গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে। খতনা, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ কোথায় না লাগে হলুদ? এ দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খাদ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হলুদের নাম। দুর্গাপূজার সময় ৯টি উদ্ভিদকে একত্রিত করে সাদা অপরাজিতা লতা ও হলুদ রঙে ভেজা সুতা দিয়ে বেঁধে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়, যাকে সাধারণ ভাষায় কলাবউ বা নবপত্রিকা বলা হয়। নবপত্রিকার গাছগুলো হলো কলাগাছ (কদলী বা রম্ভা), কচুগাছ, হলুদগাছ (হরিদ্রা), জয়ন্তীগাছ (জয়ন্তীর ডাল), বেলগাছ (বিল্ব শাখা), ডালিমগাছ (দাড়িম্ব), অশোকগাছ (অশোকের ডাল), মানকচুগাছ ও ধানগাছ। রান্নায় হলুদের গুঁড়োর কদর যতটা রয়েছে, ততটা কদর নেই গাছের ও ফুলের। হলুদ নিতান্তই এক অনাদরের বনফুল। তবু সে গাছ পূজিতা, হলুদের ফুল খাদ্য হিসেবে সমাদৃতা।

এ দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী সমাজে হলুদ ফুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। চাকমা ভাষায় হলুদকে ‘হলোত’ অথবা ‘হালধি’ বলা হয়। চাকমারা জুমে ফসল চাষ করেন, যেখানে অনেক রকম ফসলের সঙ্গে হলুদগাছও থাকে। রাঙ্গামাটির বনরূপা বাজারে আঁটি বেঁধে হলুদ ফুলের মঞ্জরি বেচাকেনা হতে দেখেছি অনেকবার। কেননা হলুদ ফুল তাদের খাদ্য সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহ্যগতভাবে জুম চাষের সঙ্গে হলুদ গভীরভাবে সম্পর্কিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম পাহাড়ে উৎপাদিত হলুদের গাছে যে ধবধবে সাদা রঙের বৃতির অবগুণ্ঠনে হালকা হলুদাভ ফুল ফোটে তা যেন তাদের ভালো ফসলের ইঙ্গিত দেয়। হলুদের পাশাপাশি সেখানে বন হলুদ ও আদাগাছও থাকে। সেসব গাছের ফুলও তারা খান। চাকমা সমাজে সালাদ, ভর্তা, চাটনি ও তরকারি রান্নার এক বিশেষ উপাদান হলো হলুদ ফুল। আদিবসী সমাজে লোক-চিকিৎসায় চাকমারা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন উদ্ভিদের ঔষধি গুণের ওপর নির্ভর করেন। সেগুলোর মধ্যে হলুদ অন্যতম। হলুদগাছের ফুল হজমশক্তি বৃদ্ধি ও শরীর সতেজ রাখতে ভেষজ উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখে। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির জুমে সেসব হলুদ ফুলের শোভা দেখে অনেকবারই মুগ্ধ হয়েছি, রান্না করা ফুলের স্বাদ নিতেও ভুলিনি।

কয়েক বছর পর ঢাকায় রমনা উদ্যানের ভেতরে ঝোপ ঝোপ হলুদগাছে ফুল ফুটতে দেখে সেসব কথাই মনে পড়ছিল। আবার মনে প্রশ্নও জেগেছিল, আমরা হলুদ কেন খাই? ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা তো কখনো কোনো রান্নায় হলুদ দেয় না, ফুলও খায় না। তাহলে বঙ্গীয় ও আদিবাসী সমাজে হলুদের এত কদর কেন? বাংলাদেশের মাছের ঝোল, ভারতীয় চিকেন কারি, সুদানের উটের বিরিয়ানি কিংবা মালয়েশিয়ার লাকসা, বালি দ্বীপের নাসি গোরিঙ এ রান্নাগুলোয় হলুদ কেন লাগে? আমাদের রান্নায় হলুদ দিতে হয়। কারণ আমরা অনেকেই একবেলা রেঁধে দুই বা তিনবেলা খাই। হলুদ হলো অ্যান্টিবায়োটিক গুণসম্পন্ন। হলুদ যেন বাংলার জাফরান। হলুদ দিয়ে রান্না করলে দীর্ঘসময় সেসব খাদ্য পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। তা ছাড়া চোখের সৌন্দর্য তো আছেই। রান্না হলদে না হলে সে খাদ্যকে ‘ট্যাশটেশে’ তকমা দিয়ে দিই, খাওয়ার আগে চাই রুচি।

হলুদ আমাদের দেশীয় গাছ। প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন গ্রন্থেও হলুদের উল্লেখ আছে। এ উপমহাদেশে হলুদের প্রায় ৪৫টি প্রজাতি পাওয়া যায়। আমরা যাকে হলুদ বলে চিনি ও খাই, সেটির প্রজাতিগত নাম ঈঁৎপঁসধ ষড়হমধ ও গোত্র জিঞ্জিবারেসী। এটি একটি কন্দজাতীয় বহুবর্ষজীবী হার্ব বা বীরুৎজাতীয় উদ্ভিদ, যা এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। মাটির নিচে আঙুলের মতো ছড়া বা কন্দ গঠিত হয়, যা হলুদ তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। পাতা দুটি সারিতে একান্তরভাবে সজ্জিত থাকে। পাতার বোঁটা ৫০ থেকে ১১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, বোঁটার সঙ্গে পত্রখথাল থাকে। পাতা সরল, উপবৃত্তাকার, অগ্রভাগ তীক্ষè, সবুজ ও চামড়ার মতো। কন্দ থেকে লম্বা ডাটির মাথায় বেশ আঁটসাঁট পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফোটে। পুষ্পমঞ্জরির একেবারে উপরের দিকে কিছু বৃতি বা উপপত্র থাকে, যেগুলোতে কোনো ফুল ফোটে না, কিন্তু শে^ত পদ্মফুলের মতো বৃতিগুলো চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। বৃতিগুলো সাদা থেকে সবুজাভ-সাদা রঙের হয়। বৃতির ভেতরে অনেকটা আড়ালেই ফুল ফোটে। উভয়লিঙ্গ ফুলগুলো একপ্রতিসম ও তিন-অংশবিশিষ্ট। হলুদের ঘ্রাণযুক্ত তিনটি উজ্জ্বল হলুদ রঙের পাপড়ি পরস্পর যুক্ত হয়ে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা একটি নলাকার গঠন তৈরি করে। ফুলের সে রূপ দেখতে হলে শরতকালে হলুদগাছের কাছে গিয়ে বসে খুব কাছ থেকে দেখতে হবে।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত