গোল, নাটকীয়তা, উসকানিমূলক ব্যানার আর একের পর এক চোটের ধাক্কা, প্যারিসের মাটিতে বার্সেলোনা ও পিএসজির ম্যাচটি উপহার দিল এক ভরপুর ড্রামা। পিএসজি সমর্থকদের উগ্র ব্যানার নিয়ে বার্সার উয়েফায় নালিশ করার সিদ্ধান্তের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুই দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক ক্লান্তি। একদিকে পিএসজির তিন তারকার ছিটকে যাওয়া, অন্যদিকে এল ক্লাসিকোর আগে বার্সার হাসপাতালে চোটের দীর্ঘ সারি, সন মিলিয়ে ৪-২ গোলের ম্যাচটি যেন রেখে গেল শুধুই ক্ষতচিহ্ন।
পিএসজির ‘সন্ত্রাসমূলক’ ব্যানার ও বার্সার উয়েফায় নালিশ
ম্যাচ শুরুর আগমুহূর্তে পার্ক দ্য প্রিসেন্সের গ্যালারিতে পিএসজির উগ্র সমর্থকরা এক বিশাল ব্যানার প্রদর্শন করে, যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। হরর মুভি ‘টেক্সাস চেইন সাউ প্রিজম’-এর ক্যারেক্টার ও ‘হ্যালোইন’-এর মাস্ক পরা এক ব্যক্তির হাতে চেইনসো দিয়ে বার্সেলোনার ক্লাব ক্রেস্ট ভাঙার ভয়ংকর সেই ছবির নিচে লেখা ছিল—'ম্যাসাকার প্যারিসিয়ান স্টাইল' (Massacre Parisian style)।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতালান ক্লাবটি এটিকে ক্রীড়ার গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া এক অগ্রহণযোগ্য প্ররোচনা হিসেবে দেখছে। মাঠের লড়াই শেষ হওয়ামাত্রই পিএসজির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে উয়েফায় কড়া অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিয়েছে বার্সেলোনা বোর্ড।
জয়ের রাতেও ইনজুরির মিছিলে স্তব্ধ এনরিকে
পিএসজির ৪-২ গোলের দারুণ জয় সত্ত্বেও ম্যাচ শেষে প্যারিস শিবিরের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে ভয়াবহ ইনজুরি সংকটে। ম্যাচের মাত্র ১৯ মিনিটে উসমান দেম্বেলে উরুর চোটে পড়ে মাঠ ছাড়েন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে একই সঙ্গে মারাত্মক ইনজুরির শিকার হন কাভিচা কাভারাৎসখেলিয়া ও অধিনায়ক মারকুইনহোস। কাভারাৎসখেলিয়ার হাঁটুতে পাওয়া গুরুতর চোট নিয়ে সতীর্থ ফ্যাবিয়ান রুইজ ম্যাচের পর গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন।
দলের এই বড় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে পিএসজি কোচ এনরিকে তাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি কোনো ডাক্তার নই, আমি কোচ। আজকের ম্যাচের সবচেয়ে বাজে দিকটি হলো এই তিনটি ইনজুরি। আগামীকাল পরীক্ষার পর চূড়ান্ত ফল জানা যাবে। তারা তিনজনই দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, তাই এটি নিশ্চিতভাবেই ভীষণ খারাপ খবর, তবে এটাই ফুটবল।’
তবে দেম্বেলে ও কাভারাৎসখেলিয়াকে হারানোর মতো বড় ধাক্কা সত্ত্বেও দলের এমন অনবদ্য পারফরম্যান্স আর প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতায় দারুণ গর্বিত স্প্যানিশ এই মাস্টারমাইন্ড। গ্যালারির উন্মাদের মতো সমর্থন এবং খেলোয়াড়দের ওপর নিজের অগাধ বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে এনরিকে আরও যোগ করেন, ‘আমার কাছে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রাই আছে, অন্তত আমার চোখে তারাই সেরা। আমি সব সময় ওদের এই কথাই বলি।’
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে দুই গোল দিয়ে অপ্রতিরোধ্য বার্সেলোনাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পেছনে শিষ্যদের অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্যারিসের সমর্থকদের শক্তির কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করেন পিএসজি বস। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি জয়ের মানসিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ‘যেকোনো প্রতিকূল ও কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দারুণ এক ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। এটিই প্রমাণ করে আমরা কেমন ধরনের দল এবং সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার কতটা সামর্থ্য আমাদের আছে। সমর্থকদের এই অবিশ্বাস্য শক্তি যখন আমরা পাশে পাই, তখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়াটা আরও অনেক সহজ হয়ে যায়।’
অন্যদিকে বার্সেলোনা শিবিরেও নেমে এসেছে ইনজুরির কালো ছায়া। ক্লাসিকোর ঠিক আগে প্রথমার্ধেই উরুর চোটে মাঠ ছাড়েন দানি ওলমো। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’ জানিয়েছে, ইনজুরির ধরণ গুরুতর হলে তাকে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হতে পারে, যা হান্সি ফ্লিকের দলের জন্য বড় ধাক্কা।
৪-২ গোলের হারেও টলেননি বার্সা কোচ
বড় ব্যবধানে হারের পর যেকোনো দলের কোচই মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন, কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন বার্সেলোনা বস ফ্লিক। পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচে রক্ষণভাগের নাজুক দশা এবং ১৫টি শট হজম করার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে ক্লান্তি ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে এনেছেন তিনি।
গত ১১ দিনে চারটি ম্যাচ খেলার ধকল এবং ঝড়ের কারণে সেভিয়া থেকে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন এই জার্মান কোচ। তবে অজুহাত না দিয়েও বাস্তবতা বোঝাতে চেয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ ফ্লিক বলেন, ‘আমরা অনেক ভুল করেছি। বিশেষ করে বল দখলে, সহজে বল হারিয়েছি... এটা বুঝতে হবে যে খেলোয়াড়রা তরতাজা নেই বলেই ভুল হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে তাদের যা করতে হয়েছে সেটা অবিশ্বাস্য। তাদের মানসিকতার প্রশংসা করি।’
দলের ভুলত্রুটি ও অপ্রস্তুতির কথা স্বীকার করার পাশাপাশি অজুহাত হিসেবে বিষয়টি না দাঁড় করিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ফ্লিক আরও যোগ করেন, ‘(বেতিসের বিপক্ষে জয়ের) পর কী হয়েছে সবাই জানে। এটি কোনো অজুহাত নয়, শুধু আপনারা যেন বুঝতে পারেন কেন হয়তো আমরা সেরা ছন্দে ছিলাম না।’
আগামী রবিবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগার 'এল ক্লাসিকো'র আগে দলকে আত্মবিশ্বাসী রাখার চেষ্টা করছেন ফ্লিক। রক্ষণের ভুল ও পরাজয়ের গ্লানি সত্ত্বেও আগামী জুনের ফাইনালের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে বার্সেলোনা কোচ বলেন, ‘আমরা ম্যাচটি বিশ্লেষণ করব, তবে আমি দলে বেশ কিছু দারুণ ইতিবাচক দিক দেখেছি এবং কিছু জায়গায় আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। আমি নেতিবাচক হতে চাই না, আমি আশাবাদী। এটি একটি ভালো অভিজ্ঞতা ছিল এবং আমাদের শুধরে নিতে হবে আমরা কোথায় ভুল করেছি। আর একটা কথা, অক্টোবরে শিরোপা নির্ধারিত হয় না, চ্যাম্পিয়নস লিগ নির্ধারিত হবে জুনে।’
সিলেটে চট্টগ্রামের বিপক্ষে নাটকীয় জয় খুলনার