ক্ষুধা মেটাতে এবং পুষ্টির প্রয়োজনে মানুষ ফসল ফলানো এবং বাজার থেকে কিনে খাদ্যের চাহিদা মেটায়। ব্যক্তির সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক সামর্থ্যরে পার্থক্যের কারণে এ চাহিদা বৈচিত্র্যময়। এই চাহিদা ও বৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে ছোট থেকে বড় এবং স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হরেকরকম ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে। এসব ব্যবসায় জড়িত সবাই যে মানুষের ক্ষুধা ও স্বাস্থ্যক্ষতির আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে করছেন, এমন নয়। ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি থাকেই। কিন্তু শুধুই প্রচুর লাভ করতে অনেকেই ভেজাল দেন। ক্ষতিকর জেনেও বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করেন। প্রতারণার আশ্রয় নেন। অনেকে ন্যূনতম পরিচ্ছন্নতারও ধার ধারেন না। এতে সামগ্রিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ঘরে ঘরে ক্যানসারসহ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বহু লোক। সমস্যা এত প্রকট যে, অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হওয়া অনেকের চিকিৎসারও সামর্থ্য নেই। আমরা এসব বিষয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছি। একইভাবে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং সমগ্র খাদ্যব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত করতে ছোট-বড়, ভ্রাম্যমাণ, স্থায়ী ও অস্থায়ী সব ব্যবসার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করা এবং যার যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য লাইসেন্স নেওয়ার বিধান আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই।
দেশে যেকোনো খাদ্য ও বিকল্প খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, মজুদ, বিক্রি ও বিপণনে মান ও ওজনসহ বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারির জন্য জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আছে। মন্ত্রী পর্যায়ে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা পরিষদ আছে। নিরাপদ খাদ্য আইন (২০১৩) ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনসহ (২০০৯) অনেক আইন, নীতি এবং বিধিবিধানও কম নেই। অনেক কর্তৃপক্ষ অভিযান চালাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, এমনকি খাদ্য আদালতও আছে। তারপরও খাদ্যে ভেজাল, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, চড়া লাভ করতে যথেচ্ছ দাম হাঁকাসহ নানাবিধ কারণে আর্থিক সামর্থ্য নির্বিশেষে ন্যূনতম মানসম্পন্ন খাদ্যসামগ্রী পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার-কীটনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং সবজি, ফল ও মাছসহ বিভিন্ন পণ্যে ক্ষতিকর রংসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মেশানো এখন ওপেন সিক্রেট। নিজে ফসল ফলিয়েও যে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত পাওয়া যাবে, তেমন সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের হিসাবে যথেচ্ছ সার ব্যবহারে দেশের ৭৬ শতাংশ কৃষিজমি এরই মধ্যে উর্বরতা হারিয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ দোকানে খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশনে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। এমনকি কেউ কেউ পেট ভরে খাবার পেলেও তা পুরোপুরি সুষম, পুষ্টিকর ও নিরাপদÑ এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার উপায় নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে আছে।
আমরা মনে করি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান তেমন কার্যকর না হওয়ার বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক, আইন এবং অবকাঠামোগত অনেক ত্রুটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের বেশ অভাব রয়েছে। দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব আছে। দুর্বল ও ধীর বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা শৃঙ্খলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অপরাধী পার পেয়ে যায়।
এমন অবস্থায়, খাদ্য ব্যবসার ধরন ও আকার অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্স নেওয়া শুধু বাধ্যতামূলক করলেই চলবে না। পুরো খাদ্যচক্র নিরাপদ করতে হলে, তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্ত হাতে দৃশ্যমানভাবে নিবন্ধনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। খাদ্যে ভেজালসহ বিভিন্ন উপায়ে যারা মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করতে হবে।
এটাও ঠিক, বেপরোয়া অপরাধীদের শুধু সাজা দিয়ে পুরো খাদ্যব্যবস্থা টেকসইভাবে নিরাপদ করা বেশ কঠিন। তাই ফসলের মাঠসহ খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, মজুদ ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে ন্যূনতম মান বজায় রাখতে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে কড়া, লাগাতার ও কার্যকর নজরদারি জারি রাখতে হবে। সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।