আর নয় নির্যাতন ও সহিংসতা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সমাজের সভ্যতার মানদ- বিবেক, অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সুউচ্চ কোনো অট্টলিকা নয় বরং সে সমাজে নারীরা কতটা নিরাপদ, সম্মানিত এবং স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারেন, সেটিই তার সভ্যতার অন্যতম পরিচয়। অথচ আমাদের সমাজের সামনে আজ নারী বা কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা, সম্মান, মর্যাদা, শ্রদ্ধা, স্নেহ ও ভালোবাসা নিয়ে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ঘর-সংসারে হিংসা-বিদ্বেষ, নির্যাতন, পণপথা বা যৌতুক, এসিড হামলা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত নারীকে হেয় করার সংস্কৃতি আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আমাদের দেশে ৮৭ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে। কন্যাশিশু থেকে কিশোরী, বালিকা, ছাত্রী, গৃহকর্মী, শ্রমজীবী,  পেশাজীবী নারীদের আজকাল ঘরের ভেতর-বাহিরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, বাস, ট্রেন, লঞ্চ বা বিভিন্ন যানবাহনে, পথে-ঘাটে, বাজারে সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, নির্যাতন, উত্ত্যক্তকরণ এমনকি হত্যার মতো ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। যার নেতিবাচক প্রভাব সমাজ ও জাতীয় উন্নয়নে পড়ছে, যা দেখার কেউ নেই। বলে রাখা ভালো, দেশে অধিক হারে মাদক বিস্তারে নারী নির্যাতন শুধু বাড়েনি বেড়েছে ডিভোর্সের সংখ্যা। তরুণ সমাজ নির্যাতনকারী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা আগের তুলনায় অধিক হারে হচ্ছে, এটি উদ্বেগজনক। নারী  ও কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন শুধুমাত্র একটি নির্যাতনের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে চিহ্নিত করে।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল রাস্তাঘাটে ঘটছে, তা নয়। বহু কন্যাশিশু, বালিকা, তরুণী বা মধ্যবয়সী নারীর জন্যও বাসাবাড়ি সবসময় নিরাপদ নয়। ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয় এটি নারীর শরীর, স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর নির্মম আক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন তরুণী নির্যাতনের শিকার হলে অনেকেই পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে ঘটনা চাপা দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তারা বলেন পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে, সমাজ কী বলবে, মেয়েটির বিয়ে হবে কি-না ইত্যাদি। অথচ সম্মান রক্ষার নামে যদি একজন নারীর কণ্ঠস্বরই স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সে সম্মান আসলে কার? যে সমাজ একজন নির্যাতিত নারীর সম্মানের চেয়ে অপরাধীর সামাজিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই সমাজের নিজস্ব মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এককভাবে পুলিশের নয়, গোটা রাষ্ট্রের। এ ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। কেননা নারীর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। নিরাপত্তার নামে নারীর স্বাধীনতা কোনোভাবেই খর্ব করা ঠিক নয় বরং পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার কাঠামোকে প্রশ্ন করাই সমাধানের পথ।

রাষ্ট্রের কাছে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রশ্ন, আর কত ধর্ষণ হবে? প্রশ্ন হচ্ছে আর কতদিন আমরা ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাসমূহকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখব এবং তার পেছনে থাকা সামাজিক মানসিকতাকে উপেক্ষা করব? কতদিন একজন নারীর কান্না সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে থাকবে, তারপর কয়েকদিনের মধ্যে জনস্মৃতি থেকে মুছে যাবে? বাংলাদেশের মতো একটি গরিব ও দরিদ্র দেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বাল্যবিবাহ এবং যৌন হয়রানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর্থিক সচ্ছলতার কারণে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্ন লেগেই থাকে। দরিদ্র পরিবারের বিবাহিত কন্যা বা বালিকাদের জীবনে বহুবিবাহ এবং বিচ্ছেদের ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। বলে রাখা ভালো, একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার নারীদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্য প্রতিনিয়ত সতর্ক হয়ে বাঁচতে হয় না। তাই আজ প্রয়োজন- শুধু প্রতিবাদ নয়, সামাজিক পুনর্গঠন, শুধু কঠোর আইন নয়, কঠোর নৈতিক অবস্থান, শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই-সংগ্রাম। কারণ নারীর মর্যাদা রক্ষা কোনো নারী-সংক্রান্ত বিষয় নয় এটি সমগ্র সমাজের মানবিকতার পরীক্ষা। আজকাল অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারে কিশোরী-তরুণী ও মহিলাদের মধ্যে বিষণœতা, ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে অনেকে হয়তো প্রশংসার মোহে বাস্তব জীবনের আনন্দ-অনুভূতি হারিয়ে ফেলেন। এতে শিক্ষার্থী বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা বা কাজের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফেসবুক-মেসেঞ্জার সাধারণত ভালো কিছুর থেকে অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। আজকাল প্রায় সমস্ত ছেলে-মেয়ে ফেসবুকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। তরুণী বা মহিলারা সবাই এখন ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল। ঘরের বউ কেন,  স্বামী-স্ত্রী সবাইকে ফেসবুক নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে দেখা যায়, এমনকি কিশোরী ও বালিকা মেয়ে গৃহবধূরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল নিয়ে টিকটক করে। বিশেষজ্ঞদের মতে- ইন্টারনেট, ফেসবুক, মেসেঞ্জার তথা স্মার্টফোনের মাধ্যমে যে হারে প্রতারণা, মিথ্যা-ছলনা,  ছলচাতুরী বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে মেয়েদের মধ্যে ডিভোর্স শুধু নয়, তাদের বিদেশে পাচার বা বিক্রি করার মতো বিপথে যেতে বাধ্য  করা হয়।

সমাজ ও পরিবারগুলোতে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যে কোনো অবস্থায় নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নসহ, সব ধরনের সহিংসতা দূর করার মাধ্যমে নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান গড়ে তোলার জন্য সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত