সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থান। এই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত সম্পদ। এই চেতনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হচ্ছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার।’ ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজা এই মূলমন্ত্রের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। দেশজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, বিপুল জনসমাগম এবং বিস্তৃত নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পূজা উদযাপিত হয়েছে। ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপ কেন্দ্র করে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ বছরের উৎসবমুখর পরিবেশ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিপরীতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও জাতীয় সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।  বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর মহা নবমীতে একই দিনে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। রাজধানীর মহাখালী ও বনানীর পূজামণ্ডপও তিনি এর আগে পরিদর্শন করেন।  সরকারপ্রধানের রাজধানীর বাইরে তিনটি বিভাগীয় শহরে গিয়ে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন নিছক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়; এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিকদের প্রতি সম্মান, সংহতি ও নিরাপত্তার আশ্বাসের প্রতীক। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের মতো ভিন্ন অঞ্চলে উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করার মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের প্রতিটি প্রান্তের নাগরিক সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকারী। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজধানীর বাইরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে সরকারপ্রধানের প্রথম উদ্যোগ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বলে যে অঙ্গীকার করে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেই অঙ্গীকারের একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে রাজনৈতিক আদর্শের প্রকৃত প্রমাণ শুধু প্রতীকী উপস্থিতি নয়; বরং সারা বছর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

গত ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন সময়ে পূজামণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩ হাজার ৭১০টি হামলার ঘটনা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংকলনের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২১ সালের দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা উদ্বেগও এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ঘটনা অস্বীকার না করে প্রতিটির নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের অঙ্গীকার হওয়া উচিত। এই ইতিহাসের আলোকে ২০২৬ সালের পূজার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা মূল্যবান। তবে কোনো একটি বছরের শান্তিপূর্ণ উৎসব অতীতের সব সমস্যার অবসান প্রমাণ করে না। বরং এবারের অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নাগরিক আস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করত; তা ছিল নিছক রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রচেষ্টা, যা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি অসংগতিপূর্ণ। কোনো দল সংখ্যালঘুদের একমাত্র রক্ষাকর্তা নয়, আবার অন্য কোনো দলও শুধু ইতিবাচক বক্তব্যের কারণে স্থায়ীভাবে সম্প্রীতির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। একইভাবে সামাজিক মাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর ছবি কিংবা উসকানিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে অপপ্রচার প্রতিরোধের নামে বাস্তব অভিযোগকে অস্বীকার করা যাবে না। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং অপরাধের ক্ষেত্রে কার্যকর বিচার।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিন বিভাগে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং এ বছরের উৎসবমুখর পরিবেশ, সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশের একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত। এই উদ্যোগের স্থায়ী মূল্য নির্ভর করবে তার ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদে নিজেদের বিশ্বাস পালন করতে পারেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন এবং অপরাধের ক্ষেত্রে সমান বিচার পান, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। এটি শুধু একটি সেøাগান নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, নাগরিক অধিকারের অঙ্গীকার এবং সাম্য ও সম্প্রীতির রাজনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত। বাংলাদেশের শক্তি তার বৈচিত্র্য আর ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যে। এ বছরের দুর্গাপূজার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে : বাংলাদেশ সবার, তাই এই দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারও সবার। এই পূজা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটি কঠিন বার্তা হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার অর্থ হলো ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করা যাবে না; কোনো রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘুদের অধিকারকে একচেটিয়াভাবে নিজের অর্জন বলে দাবি করতে পারবে না এবং কোনো সরকারের পক্ষেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।  বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নির্ভয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, মুসলমান যেন তাদের পাশে দাঁড়াতে পারেন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সমান মর্যাদায় নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারেন, আর প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজের বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারেন এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা শুধু পূজামণ্ডপে নয়; পরীক্ষা হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, আইনের সমান প্রয়োগে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের অধিকার রক্ষায়। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার ইতিবাচক অভিজ্ঞতাকে তাই একটি স্থায়ী সামাজিক অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় সম্প্রদাযেয়র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ বহুমাত্রিক মানুষের সম্মিলিত অবদানে গড়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতাকে সম্মান করেই বলতে হয় বাংলাদেশ সবার; এই দেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আনন্দের অধিকারও সবার।  শারদীয় দুর্গাপূজার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হোক এটাই বিভাজনের বদলে সহাবস্থান, বিদ্বেষের বদলে মানবিকতা, অপপ্রচারের বদলে সত্য এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বদলে নাগরিক অধিকারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারই সাম্য, সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথে আমাদের এগিয়ে নিতে পারে।

লেখক :  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত