শয্যা সংকটে রোগীর হাঁসফাঁস

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের ৫০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ রোগী। ফলে একটি শয্যার জন্য লড়তে হচ্ছে তিন থেকে চারজন রোগীকে। শয্যা না পেয়ে অনেককে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা ও করিডরে বিছানা পেতে। এতে রোগীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন তাদের স্বজনরাও। বিশেষ করে মেডিসিন, শিশু ও সার্জারি বিভাগে রোগীর চাপ বেশি। সীমিত শয্যা, চিকিৎসক, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ও চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত রবিবার কুমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন বারান্দা, লিফটের সামনে ও করিডরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এতে রোগী ও স্বজনদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলেও ভোগান্তি হচ্ছে। এ সময় কথা হয় লাকসাম উপজেলার মিজানুর রহমান সঙ্গে। তিনি বলেন, তার বাবা আব্দুল আজিজকে বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। শয্যা না পেয়ে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের ফ্লোরে বিছানা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা নিতে হলে ২-৩ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আর ভাগ্য ভালো হলে একদিনের মধ্যে শয্যা পাওয়া যায়।

একই কথা জানিয়েছেন চৌদ্দগ্রাম উপজেলার থেকে আসা মনোয়ার বেগম। অসুস্থ স্বামী ইয়াকুব মিয়াকে নিয়ে গত দুদিন ধরে ফ্লোরে বিছানা বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আশায় আছেন শয্যা পাবেন।

হিসাব করে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার ৫-৬ গুণ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালকে। কোনো কোনো বিভাগে পরিস্থিতি আরও নাজুক। অতিরিক্ত রোগীর জন্য বরাদ্দ না থাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল, স্থান ও সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে শুধু ভর্তি রোগী নয়, তাদের সঙ্গে থাকা স্বজন ও অ্যাটেনডেন্টদের কারণেও হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একজন রোগীর সঙ্গে অনেক সময় দু-তিনজন স্বজন থাকছেন। ফলে সীমিত জায়গায় রোগী ও স্বজনদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

হাসপাতাল পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৩৩ হাজার ১১৭ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৩২ হাজার ১৭৩ জন, মার্চ মাসে ২৮ হাজার ৫৫৩ জন, এপ্রিল মাসে ৪১ হাজার ৮৭৫ জন, মে মাসে ৩৪ হাজার ৮০২ জন, জুন মাসে ৪৮ হাজার ৮২৬ জন, জুলাই মাসে ৪৪ হাজার ৩১৫ জন ও  আগস্ট মাসে ৪৬ হাজার ৭১৫ জন ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন। এ ৯ মাসে মোট ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৭৬ জনকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী প্রতি মাসে হাসপাতালটিতে ৩৪ হাজার ৪৮৬ জন চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। আর প্রতিদিন ১ হাজার ২৭৭ জন চিকিৎসা নেন।

এদিকে জরুরি বিভাগে জানুয়ারি মাসে ১০ হাজার ২০৩ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ হাজার ৯৪৯ জন, মার্চ মাসে ১০ হাজার ৫৭ জন, এপ্রিল মাসে ১১ হাজার ১৮৮ জন, মে মাসে ১০ হাজার ৮৫২ জন, জুন মাসে ১১ হাজার ১২২ জন, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৪৭ জন ও আগস্ট মাসে ১২ হাজার ২২ জন চিকিৎসাসেবা নেন। এ ৯ মাসে মোট ৮৬ হাজার ৮০ জন চিকিৎসাসেবা নেন। সে হিসাবে প্রতি মাসে ৯ হাজার ৫৬৪ জন চিকিৎসাসেবা নেন। আর প্রতিদিন ৩৫৪ জন চিকিৎসাসেবা নেন।

অপরদিকে অন্তর্বিভাগে জানুয়ারি মাসে ৯ হাজার ৪৪১ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ হাজার ২৬২ জন, মার্চ মাসে ৯ হাজার ১৪১ জন, এপ্রিল মাসে ১০ হাজার ৩৬৩ জন, মে মাসে ৮ হাজার ৯১৪ জন, জুন মাসে ৯ হাজার ৩৫১ জন, জুলাই মাসে ৯ হাজার ৩১০ জন ও আগস্ট মাসে ১০ হাজার ১০২ জন চিকিৎসাসেবা নেন। এ ৯ মাসে মোট ৭৫ হাজার ৮৮৪ জন চিকিৎসাসেবা নেন। সেই অনুযায়ী প্রতি মাসে ৮ হাজার ৪৩১ জন চিকিৎসাসেবা নেন। আর প্রতিদিন ৩১২ জন চিকিৎসাসেবা নেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন বিভাগের পুরুষদের জন্য অনুমোদিত শয্যা ৪৯টি। এর বিপরীতে রবিবার ভর্তি ছিলেন ৩০২ জন। নারীদের জন্যও অনুমোদিত শয্যা ৪৯, ভর্তি ছিলেন ২০৫ জন। অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৯৮ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০৭।

এদিকে ৫৭ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। এদিন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও ১০ জন। বেড়েছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। হামের রোগী ভর্তি ছিলেন ৬১ জন। এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ জনে।

শিশু বিভাগেও পরিস্থিতি একই। ৫৪টি অনুমোদিত শয্যার বিপরীতে গত বৃহস্পতিবার ভর্তি ছিল ৩০১ শিশু। এসব শিশুর মধ্যে জ্বর, নিউমোনিয়া, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মঞ্জুর বলেন, যেসব রোগীকে ভর্তি না করলেই নয়, মূলত তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। এরপরও অনুমোদিত শয্যার প্রায় পাঁচগুণ রোগী ভর্তি রয়েছেন।

হাসপাতালের বহির্বিভাগেও রোগীর চাপ কম নয়। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো না থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জাবেদ আহমেদ বলেন, সুন্দর ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসকদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। কারণ, সীমিত সম্পদ ও জনবল দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা ও সেবার চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় জনবল ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে কুমেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. শাহজাহান বলেন, ‘ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। তবে যাই হোক না কেন, কোনো রোগী ভর্তি হলে আমরা সিট না দিতে পারলেও অন্তত চিকিৎসাসেবা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করি। কারণ ৫০০ জনের চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে ১২০০-১৩০০ রোগীর সেবা দিচ্ছি। এতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, তারপরেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত