সম্ভাবনা জাগিয়েও অচল বাল্লা বন্দর

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

যে প্রতিষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত মানুষের কর্মব্যস্ত থাকার কথা, আশপাশে গড়ে ওঠার কথা নানা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন সুনসান নীরবতা। অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। কোথাও ঘাস খাচ্ছে গরু-ছাগল, কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাচ্ছে ভবন ও সড়ক। বলা হচ্ছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা স্থলবন্দরের কথা। একটি আদর্শ স্থলবন্দর হিসেবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হলেও চালু করা যায়নি এর কার্যক্রম। ফলে সরকারের বিপুল বিনিয়োগের সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। উল্টো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে দুই থেকে তিন লাখ টাকা। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়মুড়া এলাকায় প্রয়োজনীয় সড়ক যোগাযোগ ও শুল্ক স্টেশন গড়ে না ওঠায় বন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ফলে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পরও পুরনো পদ্ধতিতে ঝুঁকি নিয়ে নদীপথে ও মাথায় করে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

অবকাঠামো আছে, নেই কর্মচাঞ্চল্য : গত ৮ অক্টোবর দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চুনারুঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কেদারাকোট গ্রামে সাত একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাল্লা স্থলবন্দর। নান্দনিক নকশায় নির্মিত ভবন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ইয়ার্ড ও অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে পুরো এলাকাটি দেখতে ছোটখাটো শহরের মতো। কিন্তু মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। অব্যবহৃত প্রাঙ্গণে গরু-ছাগল ও ভেড়ার পাল ঘাস খাচ্ছে। বন্দরের ভেতরে রয়েছে অফিস ভবন, ডরমিটরি, সীমানাপ্রাচীর, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। তবে নিয়মিত ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে অনেক স্থাপনা ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন সরঞ্জামও। বন্দর এলাকার ভেতরে এখনো চার-পাঁচটি পরিবার বসবাস করছে। রয়েছে একটি মুদির দোকানও।

দোকান মালিক রোকেয়া জানান, জমি অধিগ্রহণের টাকা এখনো পরিশোধ না করায় তারা পৈতৃকভিটা ছেড়ে যাননি। তার মতো অন্য কয়েকটি পরিবারেরও একই দাবি। বন্দর এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে আরডিটিএল নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। নিরাপত্তাকর্মী জালাল জানান, বন্দরে পালাক্রমে তিনজন এবং কোয়ার্টারে দুজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেন। মাঝেমধ্যে স্থানীয় লোকজন স্থাপনাটি ঘুরে দেখে যান। বাকি সময় বন্দর এলাকাটি নীরব থাকে।

৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প, সুফল অধরা : ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ বাল্লা শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১৭ সালের ১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বন্দরের ইয়ার্ড, ওজন মাপার যন্ত্র, অফিস ভবন, ডরমিটরি, সীমানা প্রাচীর, অভ্যন্তরীণ সড়কসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে প্রত্যাশা ছিল, তা-ও পূরণ হচ্ছে না।

ভারতের অংশে সড়ক ও শুল্ক স্টেশনের অভাব : বাল্লা স্থলবন্দর চালু না হওয়ার প্রধান বাধা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়মুড়া এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি। বাল্লা স্থলবন্দরের সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে আসাম-আগরতলা মহাসড়ক থাকলেও সেখান থেকে পাহাড়মুড়ায় যাওয়ার উপযোগী সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে সেখানে যাওয়ার জন্য রয়েছে সরু হাঁটাপথের মতো একটি রাস্তা। সরেজমিন সীমান্তের ওপারে ভারতের কাঁটাতারের পাশে একটি পাকা দেয়াল ও টিনের চালার ঘর দেখা যায়। কেদারাকোট গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এটিকে ওপারের শুল্ক স্টেশনের স্থাপনা বলে জেনেছেন। বাল্লা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওপারে ছোট পরিসরে শুল্ক স্টেশন তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় সড়ক নির্মাণের কাজ এখনো বাকি। ফলে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত পণ্য পরিবহনের জন্য পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

চালুর সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে : বাল্লা স্থলবন্দরের সুপারিনটেনডেন্ট সবুজ চন্দ্র রায় বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। বন্দরটি চালু থাকলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার পথ সুগম হতো। প্রতি বছর ভারত থেকে ১০-১৫ কোটি টাকার আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে ৪-৫ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। তিনি জানান, ভারতের অংশে ছোট পরিসরে শুল্ক স্টেশন তৈরি হয়েছে। তবে সড়ক নির্মাণের কাজ এখনো বাকি রয়েছে। বন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়টি এখন পুরোপুরি দুই দেশের সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত