পাহাড়ে উৎসবমুখর প্রবারণা পূর্ণিমা, শুরু হচ্ছে কঠিন চীবর দান

রাঙামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির তার বাণীতে বলেন, পরস্পরের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করাই প্রবারণার অন্যতম প্রধান শিক্ষা। সব ধরনের হিংসা-দ্বেষ দূর করে সকলে যাতে মিলেমিশে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং পুণ্যময় কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে—ভগবান বুদ্ধের মূল শিক্ষা এটিই।
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ব্যাপক ধর্মীয় ভাবগাম্ভের্যে  বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্‌যাপিত হচ্ছে।
 
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকেই রাঙামাটির প্রধান বৌদ্ধ ধর্মীয় উপাসনালয় রাজবন বিহার, মৈত্রী বিহার, আনন্দ বিহারসহ খাগড়াছড়ির কমলছড়ি আম্রকানন বৌদ্ধ বিহার, গোলাবাড়ী আর্য অরণ্য ভাবনা কুঠির ও ধর্মপুর আর্যবন বিহারসহ বিভিন্ন বিহার পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নর-নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা ফুল, ফল এবং ভিক্ষুদের খাবার পিণ্ডসহ নানা দানীয় সামগ্রী নিয়ে বিহারগুলোতে হাজির হন।

উৎসবের শুরুতে রাঙামাটি রাজবন বিহারে ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে পবিত্র বুদ্ধ পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশ, বুদ্ধপূজা, পিণ্ডদান, প্রবারণা পূরণ, বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কার দান, হাজারবাতি দান, পঞ্চশীল প্রার্থনা, উৎসর্গ এবং সদ্ধর্ম দেশনা অনুষ্ঠিত হয়। অগণিত পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে রাঙামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির এবং খাগড়াছড়ির কমলছড়ি আম্রকানন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির ভান্তে পুণ্যার্থীদের উদ্দেশে সদ্ধর্ম দেশনা প্রদান করেন।

ধর্মীয় আচার পালনের সময় পুণ্যার্থীরা জানান, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত দীর্ঘ তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিজস্ব বৌদ্ধবিহারে অবস্থান করে নির্বাণ লাভের আশায় আত্মশুদ্ধির জন্য কঠোর সংযম ও ধ্যান-সাধনা পালন করেন। এই তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিজস্ব বিহারের বাইরে কোথাও রাত্রিযাপন করতে পারেন না।
 
কেবল ভিক্ষুরাই নন, সাধারণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নর-নারীরাও এই বর্ষাবাসের নানা নিয়ম পালন করে থাকেন। ভিক্ষুদের এই ধ্যান ও সাধনা পূর্ণতার জন্য সাধারণ উপাসক-উপাসিকারা তাদের চীবর, পিণ্ডদান ও নানাবিধ দানসামগ্রী প্রদান করেন। তিন মাসের এই বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে প্রবারণা পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে।

রাঙামাটি রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির তার বাণীতে বলেন, পরস্পরের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করাই প্রবারণার অন্যতম প্রধান শিক্ষা। সব ধরনের হিংসা-দ্বেষ দূর করে সকলে যাতে মিলেমিশে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং পুণ্যময় কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে—ভগবান বুদ্ধের মূল শিক্ষা এটিই।

খাগড়াছড়ির কমলছড়ি আম্রকানন বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির ভান্তে জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে নর-নারীরা নানা ধরনের দানকার্য সম্পাদনের মাধ্যমে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হন। ধর্মীয় এই আচার ও প্রার্থনা শেষে সন্ধ্যার সময় বিশ্ব শান্তি ও সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল কামনায় বিহার প্রাঙ্গণে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন এবং আকাশ প্রদীপ বা ফানুস ওড়ানো হয়। ফানুস ওড়ানোর আলোয় পাহাড়ি জনপদের আকাশ এক নান্দনিক রূপ ধারণ করে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠানমাত্র নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের বহুদিনের পুরনো এক মিলনমেলা ও আবহমান সংস্কৃতির অনন্য রূপ। বছরের পর বছর ধরে প্রবারণা পূর্ণিমা পাহাড়ি জনপদের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও আনন্দ-আলোকের প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে।

এদিকে প্রবারণা পূর্ণিমার এই প্রধান ধর্মীয় উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই পাহাড়ে শুরু হতে যাচ্ছে বৌদ্ধদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানানুষ্ঠান। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকেই যে সমস্ত বৌদ্ধ বিহারে ভিক্ষুরা বর্ষাবাস পালন করেছেন, সেগুলোতে মাসব্যাপী ‘কঠিন চীবর দানোৎসব’ শুরু হবে।
 
বৌদ্ধ ধর্মানুসারে কঠিন চীবর দানকে দানগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বিহারে বছরে মাত্র একবারই কঠিন চীবর দান করা যায়। ফলে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার ও জনপদে আগামী এক মাস জুড়ে ব্যাপক উৎসবমুখর পরিবেশ ও আত্মিক আনন্দের আবহ বজায় থাকবে।
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত