হেমন্তে ছাতিমের ডালে ডালে ফুল, সুবাসে মুগ্ধ প্রকৃতি

একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট ও বনজঙ্গলে প্রচুর ছাতিম গাছ দেখা গেলেও এখন কমছে সংখ্যা। মৌলভীবাজারের কয়েকটি এলাকায় ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে বিপন্নপ্রায় এই গাছের ডালপালা।

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছাতিম গাছ। শান্তিনিকেতনে এই গাছের তলায় বসেই তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও পাঠদান করতেন। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পড়াশোনা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রথম উপহার হিসেবে দেওয়া হতো ছাতিমের পাতা। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতেও ছাতিম ফুল শান্তি, সৌন্দর্য ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর-ফেঞ্চুগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান সড়কের কাকিয়ারপুল এলাকায় এবং বিরাহিমপুর এলাকায় রয়েছে তিনটি বিশালাকার ছাতিম গাছ। হেমন্তের শুরু থেকেই গাছগুলোর ডালপালা ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। বিপন্নপ্রায় এই গাছগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং ফুলের মধুমাখা সুবাস নিতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।

শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসেও ছাতিম ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের বর্ণনা রয়েছে। কবি মোহাম্মদ জায়েদ আজিজের কবিতাতেও উঠে এসেছে ছাতিম ফুলের মুগ্ধতা। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান করে নেওয়া এই সুগন্ধি ফুল এখন ফুটেছে হেমন্তের প্রকৃতিতে।

ছাতিম একটি তীব্র সুগন্ধি ফুলের গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris। গাছটি Apocynaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশে ছাতিমকে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ইংরেজিতে এর নাম ‘ডেভিলস ট্রি’, যার অর্থ শয়তানের গাছ। গাছটির সঙ্গে শয়তানের যোগসূত্র রয়েছে—এমন বিশ্বাসও প্রচলিত আছে। বিভিন্ন অঞ্চলের উপকথা ও কিংবদন্তিতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকে এই গাছের নিচে বসতে বা এর ছায়া মাড়াতে চান না বলে উল্লেখ রয়েছে।

ছাতিমের আদিনিবাস ভারতীয় উপমহাদেশসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা। বাংলাদেশের আর্দ্র, কর্দমাক্ত ও জলসিক্ত স্থানে এ গাছ বেশি জন্মে। একগুচ্ছ ফুলকে সাতটি পাতা একসঙ্গে ঘিরে রাখে বলে সংস্কৃত ভাষায় ছাতিমকে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ বলা হয়।

ছাতিমের নরম কাণ্ড দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড, পেনসিল ও প্যাকিংবক্স তৈরি করা হয়। বৃক্ষ গবেষকদের মতে, গাছটির ছাল ও আঠা জ্বর, হৃদরোগ, হাঁপানি, ক্ষত, আমাশয় ও কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় সহায়ক বলে বিবেচিত।

একসময় বাংলাদেশের রাস্তার পাশে, বন-জঙ্গলে প্রচুর ছাতিম গাছ দেখা যেত। কিন্তু বাণিজ্যিক মূল্য কম থাকায় গাছটি রোপণে মানুষের আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি নির্বিচারে গাছ কেটে বসতবাড়ি নির্মাণের ফলে অন্যান্য গাছের সঙ্গে ছাতিমও হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে।

এখন হেমন্তকাল। ছাতিমের তীব্র সুগন্ধি ও অপূর্ব সৌন্দর্যময় ফুল ফোটার সময় এটি। গাছের ডালে ডালে ফুল ফুটলে আশপাশের এলাকা মধুময় সুবাসে ভরে ওঠে। ছাতিম গাছ ও এর ফুলের সৌন্দর্য প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল আনওয়ারুল উলুম ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাফসা খাতুন বলেন, একসময় তাদের এলাকায় অনেক ছাতিম গাছ ছিল। হেমন্তে ফুল ফুটলে পুরো এলাকা সুগন্ধে ভরে যেত।

ছোটবেলায় মা-চাচিদের কাছে তিনি শুনেছেন, গাছটির সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঔষধি ব্যবহারও ছিল। জ্বর, আমাশয় ও ক্ষত সারাতে এর বাকল ও আঠা কাজে লাগানো হতো।

হাফসা আরও খাতুন বলেন, একসময় গ্রামগঞ্জে প্রচুর ছাতিম গাছ দেখা গেলেও কাঠের বাণিজ্যিক মূল্য কম হওয়ায় এখন কেউ তেমন গাছটি রোপণ করে না। ফলে ক্রমেই কমছে ছাতিমের সংখ্যা। আগামী প্রজন্মের কাছে এই গাছের পরিচয় ধরে রাখতে এটি সংরক্ষণ করা জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত