মধ্যরাতে মুক্তিযোদ্ধা মানিকের দাফন, তাসনিম জারার ক্ষোভ

যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে। মানিক পশারীর দাফন নিয়ে এমন মন্তব্য করে বিচার, মানবাধিকার ও মৃতের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে বাধা ও বিতর্কের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তিনি বলেনন, মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের হাতে কবর খুঁড়তে হয়। পরে মধ্যরাতের পর পুলিশ পাহারায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে ঘটনাটিকে অমানবিক উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

পোস্টে তাসনিম জারা লেখেন, সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খোঁড়ার জন্য কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে এগিয়ে আসে। কেউ বাঁশ কাটে, কেউ চাটাই নিয়ে আসে। মৃত ব্যক্তির দাফনে দেরি করা উচিত নয়- এটা শুনেই বড় হয়েছি।

তিনি উল্লেখ করেন, শনিবার সকাল ১০টার দিকে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর সারা দিন মরদেহ দাফন নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় তার পরিবারকে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করে এবং মাইক ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলে জানান।

তাসনিম জারার পোস্ট অনুযায়ী, প্রথমে বাড়িতে মানিক পশারীর জন্য একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। তবে তার মেয়ে সীমু আক্তারের ভাষ্য, কয়েকজন এসে সেই কবর ভরাট করে দেন। পরে ফুফুদের নিয়ে তিনি নতুন করে কবর খোঁড়েন। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খোঁড়ার জন্য আর কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে পরিবারের নারীদেরই এ কাজ করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশ পাহারায় মেয়ে ও বোনদের খোঁড়া কবরে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা।

তিনি আরও জানান, মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে গার্ড অব অনার দিতে না দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। দাফনের পর ওই নেতাই বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলেও তা যাচাই করার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা। তার ভাষ্য, জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেই প্রশ্নের মীমাংসা করার পথ হিসেবে দাফনে বাধা দেওয়া এবং মাইক হাতে ঘোষণা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।

পোস্টে তিনি বলেন, সাধারণত জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা সবার কাছে ক্ষমা চান। মানুষও মৃত্যুর পর সব হিসাব-নিকাশ শেষ হয়েছে- এমন বিশ্বাস থেকে ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু মানিক পশারীর ক্ষেত্রে পরিবার সেই সুযোগটুকুও পায়নি। নিজের গ্রামে তার জানাজা হয়নি, গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও পায়নি পরিবার।

তাসনিম জারা আরও প্রশ্ন তোলেন, পিরোজপুরে মানিক পশারীকে দাফন করতে দেওয়া হবে না- এমন ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা যেন ওই এলাকার মাটির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। অথচ একজন মানুষ নিজের পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণ করার অধিকার কারও থাকার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, সেই দলের নেতাকর্মীরা এখন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন এবং কার কবর কোথায় হবে- তা নির্ধারণ করতে চাইছেন।

পোস্টের শেষাংশে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে জামায়াতের বক্তব্যের সঙ্গে তাদের আচরণের অসংগতি তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি প্রশ্ন করেন, বিরোধী দলে থাকতেই যদি একজন মৃত ব্যক্তিকে নিজের বসতভিটায় দাফন করতে বাধা দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তাদের হাতে গেলে কী ঘটবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত