সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, কোথাও যদি ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয় এবং সরকার অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব। আইজিপির এ ধরনের বক্তব্যের পর বিভিন্ন সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা তার সমালোচনা করেন। এদিকে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার কমিউনিটি ব্যাংকের চকবাজার ইসলামিক ব্যাংকিং শাখা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপি এসব কথা বলেন।
পুলিশের দায়িত্ব পালন ও বলপ্রয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে আইজিপি বলেন, পুলিশ লাঠিপেটা করলে বলা হয় পুলিশ ফ্যাসিস্ট, আবার নীরব থাকলে বলা হয় দুর্বল পুলিশ। এ অবস্থায় পুলিশকে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে সক্ষম করতে হবে। সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চলতে হবে। পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। গুজব ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা জরুরি। কে আসবে, আপা কবে আসবে ওইটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় নয়। দায়িত্ব, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই করব। দেশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে পুলিশের কোনো বিকল্প নেই।
আইজিপি বলেন, পুলিশকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবেন না, নিজেরাও ব্ল্যাকমেইল হবেন না। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন, এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে দিন। আমরা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করিনি। কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করিনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের যে অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করতে ভয় পেত, কোথাও যেতে সাহস পেত না। সেই অবস্থা থেকে উন্নয়নের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি।
সাংবাদিকরা মাদকের টাকা না পেলে পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করেন বলে মন্তব্য করেছেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন। বর্তমানে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে একটি গোষ্ঠী জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। পলাতক সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকার্যকর করেছেন। তাদের আমলেই পাড়ায়-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে। তৎকালীন সরকারি দলের নেতারা মাদক থেকে মাসোহারা পেতেন এবং পুলিশেরও কিছু সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। তবে আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি। গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসব বিষয় নিয়েও অপব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি পুলিশের সমালোচনা করে দেওয়া নাগরিক সমাজের এক বিবৃতির প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, ১০১ নাগরিক বলছেন গোপনীয়তার কথা। আপনি কি পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতরে গোপনে গিয়ে মদ খাবেন, মাতলামি করবেন, কোকেন-হিরোইন গ্রহণ করবেন? সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে, এসব আপনার অধিকার? স্বাধীনতা আছে বলে যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন না, আইনের আওতায় থাকতে হবে। পুলিশের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হলে এবং পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা না করলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আইজিপি বলেন, মাদক কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ কেউ নিজেরাই মব তৈরি করছেন, আবার সেখান থেকে গোপনে টাকা নিচ্ছেন। সাংবাদিকরা ওখান থেকে যখন পয়সা পান না, তখন লিখছেন পুলিশ এই দেশে অকার্যকর হয়ে গেছে। কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করিনি, কোনো অনাকাক্সিক্ষত বলপ্রয়োগও করিনি।
আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ফিরিয়ে আনতে চান : আইজিপি আলী হোসেন ফকির ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ফিরিয়ে আনতে চান বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারকে আইজিপির বিরুদ্ধে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল সোমবার রাজধানীতে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আইজিপি মানুষকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছেন, তার বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে ধরে নেব আবারও ক্রসফায়ার, গুম ও খুনের দিকে হাঁটছে সরকার।
‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যাখ্যা : আইজিপির বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও শিরোনাম সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি। একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি, এটি অসাবধানতাবশত হয়েছে।
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ সাংবাদিক সংগঠনগুলোর : সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির দেওয়া আপত্তিকর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাংবাদিক সংগঠন ডিআরইউ ও ক্র্যাব। বক্তব্য প্রত্যাহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠন দুটি। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেওয়া হবে।
‘ক্রসফায়ার’র বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক : ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাক ফাউন্ডেশন। গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উপায় হতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ‘ক্রসফায়ার’ করার বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো বৈধতা নেই।
টিআইবির উদ্বেগ ও নিন্দা : ক্রসফায়ার আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। গতকাল সোমবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ। আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াসহ বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি। ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।