জাপান-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ‘বিগ বি’ নিয়ে মতৈক্য

বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সংযোগ বা কানেক্টিভিটির গুরুত্ব বিবেচনা করে দুই নেতা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে এক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে টোকিওতে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পরে দুই দেশের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত এক যৌথ বিবৃতিতে এর বিস্তারিত দিক তুলে ধরা হয়। 
 
 
বিবৃতিতে বলা হয়, সোম থেকে বৃহস্পতিবারের (২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর) চলমান তারেক রহমানের এই সরকারি সফরে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক অভিন্ন ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

বৈঠকের শুরুতে দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বজায় থাকা আস্থার সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় জাপানের অবিচল ও উদার উন্নয়নের সমর্থনের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি একটি শান্তিপ্রিয় ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাপানের গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
 
এতে আরও বলা হয়, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশে একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের চর্চার প্রশংসা করে বলেন যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন সমগ্র বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। জাপানি সরকার প্রেরিত স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে তিনি এই সফল নির্বাচনকে স্বাগত জানান।
 
একই সঙ্গে, তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। দুই নেতাই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের মতো সার্বজনীন মূল্যবোধের প্রতি তাঁদের দৃঢ় ও অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকের সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী ঘোষণা ছিল দুই দেশের ফ্ল্যাগশিপ সহযোগিতা উদ্যোগ ‘বিগ-বি’-কে যুগোপযোগী করে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটির জন্য বিগ-বি’-এ উন্নীত করা। বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য ঝুঁকি, দ্রুতগতির প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশ পারস্পরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে।
 
নতুন এই কাঠামোর আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক শিল্প কারখানা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও ভারী শিল্পের একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক হাব বা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উভয় দেশ যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
 
বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সংযোগ বা কানেক্টিভিটির গুরুত্ব বিবেচনা করে দুই নেতা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত ৩ নম্বর টার্মিনাল দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে চালুকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
 
পাশাপাশি, ঢাকার মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় জাপানি কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় জ্বালানি মজুদ বৃদ্ধি এবং উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
 
জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কাঠামোর আওতায় প্রথম ঋণ প্রকল্প হিসেবে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য জরুরি সহায়তা ঋণ’ প্রদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-নির্গমন কৌশল প্রণয়ন এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
 
এতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বর্তমান সরকারের সংস্কারমূলক পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেন। আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে উন্নীত করার এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা উভয় পক্ষকে উৎসাহিত করেছে।
উৎপাদন খাত, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইসিটি এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে পরিপূরক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করতে করপোরেট করপদ্ধতি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছে জাপান। এছাড়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ)-এর স্বাক্ষরকে দুই দেশ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে, যা স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের মসৃণ, টেকসই এবং নিরাপদ উত্তরণে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। আঞ্চলিক সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে জাপান।
 
বিবৃতিতে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান জটিল ও অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’-র সফল স্বাক্ষর ও কার্যকারিতা উভয় দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও গৌরবময় অবদানের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উপকূলীয় টহল এবং বন্দর সুরক্ষায় জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) এবং অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স (ওসিএ)-এর আওতায় টহল জাহাজ ও নৌকা সরবরাহের বিষয়গুলো দুই দেশের সমুদ্র নিরাপত্তা অংশীদারত্বকে আরও সুসংহত করবে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ ২)’-এর ঋণ ঘোষণাকে স্বাগত জানান। জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়। জাপানি সরকারের (এমইএক্সটি) শিক্ষাবৃত্তি এবং বাংলাদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মেলবন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্পষ্ট। ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী সমুদ্রপথে নেভিগেশন ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সকল সামুদ্রিক বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের ক্রমবর্ধমান সংকট ও এর আঞ্চলিক প্রভাবে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই নেতাই অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উৎস মিয়ানমারে এবং এর একমাত্র সমাধান হলো বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন। মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং নাবিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায়সংগত ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে জানানো হয়, সফরের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং সে দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
 
এই শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে জাপান ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল, যা উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত