প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে উৎপাদকদের দায়িত্ব নিশ্চিত করা, পুনর্ব্যবহার খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, অপরিকল্পিতভাবে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন ও নালা-নর্দমা বন্ধ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে দূষিত হচ্ছে নদী ও সামুদ্রিক পরিবেশ। এ সংকট মোকাবিলায় নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর গুলশানের দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনআইডিও) আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। নরওয়ে সরকারের সহায়তায় পরিচালিত ‘ইন্টিগ্রেটেড অ্যাপ্রোচ টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল প্লাস্টিকস ইউজ অ্যান্ড মেরিন লিটার প্রিভেনশন ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের সমাপনী উপলক্ষে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের (রুটিন দায়িত্ব) দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ নাভিদ সাফিউল্লাহ বলেন, শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্লাস্টিক উৎপাদকদের বর্ধিত দায়িত্ব (ইপিআর) কার্যকর করার পাশাপাশি উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারকারীদের সঙ্গে প্রশাসনিক সমন্বয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য পৃথকীকরণ ও সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নূরুন নাহার বলেন, উৎপাদকদের বর্ধিত দায়িত্ব, পরিচ্ছন্ন উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব নকশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিল্প খাতের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ইউএনআইডিও বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন বলেন, নীতিমালা প্রণয়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহার খাতে প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সরকারের সঙ্গে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে আগ্রহী সংস্থাটি।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে ইউএনআইডিওর ভিয়েনা কার্যালয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ড. রানা প্রতাপ সিং জানান, ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি রাজনৈতিক পরিবর্তন, বন্যা, তাপপ্রবাহ, হরতাল ও নির্বাচনের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে কার্যকরভাবে মাত্র ৫২০ কর্মদিবসে ৩০০টির বেশি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার রাতারাতি বন্ধ করা প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; বরং পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য রেখে এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্লাস্টিক খাতের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বর্জ্য খাতের অবদান ৭ থেকে ৮ শতাংশ হলেও প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার খাতের অবদান ০.২৫ শতাংশের নিচে। নতুন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এ খাতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্পের অন্যতম অর্জন হিসেবে উৎপাদকদের বর্ধিত দায়িত্ব (ইপিআর) নির্দেশিকা প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশের কথা জানান তিনি। পুনর্ব্যবহারকারীদের ব্যবসাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনতে ‘প্লাস্টিক পাথ’ নামের একটি সফটওয়্যার তৈরি করে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় দেশের প্রথম ‘কমন ট্রিটমেন্ট ফ্যাসিলিটি’ স্থাপন করা হয়েছে। এটি সফলভাবে পরিচালিত হলে সারা দেশে এ ধরনের মডেল ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, সিরাজগঞ্জে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মডেলটি অন্য জেলাগুলোতেও অনুসরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, প্রকল্প শেষ হলেও প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকবে।
সমাপনী বক্তব্যে উপপ্রকল্প পরিচালক কাজী সুমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিল্প সমিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।