মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদের শততম জন্মবার্ষিকী নানা আয়োজনে উদযাপন করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে তাঁর জন্মভূমি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার রফিকনগরে তিন দিনব্যাপী মেলা, কেক কাটা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের রফিকনগরে শহীদ রফিক মঞ্চে ভাষা শহীদ রফিক স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা। তিনি শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জন্মশতবার্ষিকীর কেক কাটেন।
ভাষা শহীদ রফিকের অনুজ খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে এবং প্রভাষক জগদীশ চন্দ্র মালোর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন্নাহার পপি, সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল আমিন কবির, একুশে পদকপ্রাপ্ত কাওসার চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা মফতেজুর রহমান, শহীদ রফিকের ভাতিজা আবদুর রউফ, মিজানুর রহমান, আওলাদ হোসেন, আসাজ্জামান ও শাহিনুর রহমান।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার সিংগাইর উপজেলা বলধারা ইউনিয়নের পারিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিক উদ্দিন আহমেদ। তাঁর বাবা আবদুল লতিফ ও মা রাফিজা খাতুন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৪৯ সালে স্থানীয় বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় গিয়ে বাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন। তাঁর জন্মস্থান পারিল গ্রামটি বর্তমানে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রফিকনগর নামে পরিচিত।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নেন রফিক। সেদিন ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে মিছিল এগিয়ে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি। পরে সামরিক বাহিনীর পাহারায় রাতের আঁধারে ঢাকা আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর।
ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে জন্মভূমি রফিকনগরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘর। শত বছর পেরিয়েও মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।