জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এ কারণে দেশটির নারিতা বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফিরতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগের দক্ষতা, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
এর আগেও এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে বিমানে। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে এ ঘটনায় প্রকৌশল বিভাগে শাস্তির খড়গ নেমে আসছে বলে বিমানের একটি সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি বিমানের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাও তদন্তের জালে আটকা পড়ছেন।
বিমানসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে আরও ‘ভালো আস্থায়’ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে সব সরকারেরই। দায়িত্ব নেওয়ার পর সবাই প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার ঘোষণা দেন। কিন্তু ‘লাভের আলো’ দেখছেন না কেউ। আওয়ামী লীগ আমলেও লাভজনক হয়নি সংস্থাটিতে। উল্টো সমস্যায় কাবু হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন সরকার আসার পর ‘অনেকটা ঢেলে সাজানো’ হয়েছে কর্তাদের চেয়ার। চুক্তি করা হয়েছে ২৪টি বোয়িং ও এয়ারবাস কেনার। নতুন নিয়োগ হয়েছে প্রধান নির্বাহী ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন গড়ে ১৮৭ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু লাভের মুখ না দেখলেও আগের চেয়ে চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহীসহ কয়েকজন বড় কর্তার বেতন দ্বিগুণও হয়েছে। এ নিয়ে অন্য কর্তারাও নাখোশ। প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রায় ৪২ কোটি টাকা। এতকিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটি ধরা পড়ায় নানা রহস্যর সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্তের জালে একাধিক কর্মকর্তা : প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট ত্রুটির ঘটনায় গত শুক্রবার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কমিটিতে বিমানের চিফকে (প্ল্যানিং অ্যান্ড সিডিউলিং) সভাপতি এবং ব্যবস্থাপককে (আইনবিষয়ক) সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) এবং ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি)। চার কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। কমিটি ত্রুটির আসল কারণ শনাক্তকরণ ও নিরসন প্রক্রিয়া, উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ, আর্থিক ক্ষতি এবং দায়িত্বে অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কিনা সেসব বিষয়ে খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি ফ্লাইট বিলম্ব, যাত্রীদের ভোগান্তি এবং বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাবের পর্যালোচনাও করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিমানের এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের জালে একাধিক কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়েছে। কেবল একটি তদন্ত কমিটি গঠন বা দায়সারা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিমানের প্রকৌশল ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগে কঠোর প্রশাসনিক সংস্কার আনা জরুরি। যেসব প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দুর্নীতির কারণে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভিভিআইপি প্রটোকলকে হুমকির মুখে ফেলছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
আলোচনা প্রকৌশল বিভাগ : ঘটনার পর বিমানের প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, উড্ডয়নের আগে কারিগরি পরীক্ষা এবং ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত সমাধানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের একটি ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উড়োজাহাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা, হাইড্রোলিক ব্যবস্থা, ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ককপিটের সতর্কসংকেত যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে তা নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। তবে উড়োজাহাজে ত্রুটি দেখা দেওয়া মানেই প্রকৌশলীদের গাফিলতি বলা যাবে না। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় প্রকৌশল বিভাগের কেউ না কেউ শাস্তি পাবেই। অনেককে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। এর আগেও বিমানে একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
পেশাদারত্বের মধ্যে কাজ করতে হবে : সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানে পেশাদারত্বের অভাব আছে। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে পুরো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। উড্ডয়নের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, সব সরকারই বিমানে ‘নিজেদের লোক’ বড় পদে বসিয়ে দিচ্ছে। বিমানের আয়ের তুলনায় খরচ বেশি। তবে বড় পদগুলোতে অ্যাভিয়েশনের লোকজন না থাকলে কখনো উন্নতি হবে না। রাজনৈতিক বাহিরেই রাখলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে।
ফ্লাইট চলার পরও ছিল বিঘ্নিত হওয়ার শংকা : বিমান সূত্র জানায়, ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে জাপানের নারিতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটটির উড্ডয়নের কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে উড়োজাহাজটি পুশব্যাক করে রানওয়ের দিকে ট্যাক্সি করার সময় ককপিটে স্পয়লার-সংক্রান্ত লাল সংকেত দেখা দেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে পাইলট ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পরে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর তোলপাড় শুরু হয়। ত্রুটি নিরসনে প্রকৌশলী সাদেকুল সাড়ে চার ঘণ্টায়ও স্পয়লারের ত্রুটি পুরোপুরি দূর করতে পারেননি। এমইএলের আওতায় উড়োজাহাজটিকে ঢাকায় ফেরার উপযোগী করা হয়। এ কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করতে হয়েছে। অন্য স্পয়লারেও সমস্যা দেখা দিলে উড়োজাহাজটির নিরাপদ পরিচালনা বিঘ্নিত হওয়ার শংকাও ছিল।
বিমানের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মতো ভিভিআইপির ফ্লাইটে আরও যতœশীল হওয়া উচিত ছিল। এর আগেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কারও কোনো ধরনের জবাবদিহি নেই। যে যেভাবে পারছে অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো আমাদের বিবেচনায় আনতেই হবে।
এর আগেও ঘটেছে একাধিক ঘটনা : এ ঘটনার আগেও বিমানের ফ্লাইটে একাধিক কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর উড়োজাহাজ হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণ করেছিল। ইঞ্জিনের তেলের চাপসংক্রান্ত সমস্যায় ওই ঘটনা ঘটে। পরবর্তী তদন্তে ইঞ্জিনের লুব্রিকেশন ব্যবস্থায় একটি নাট-ঢিলা থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শেখ হাসিনাকে টোকিওতে নামিয়ে দিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। তবে ওই সময় প্রধানমন্ত্রী উড়োজাহাজে ছিলেন না। বিমান সূত্র জানায়, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সূত্র হলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং লোকসান কমানো, সেখানে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। একদিকে কমছে রিজার্ভ বা ফান্ডের পরিমাণ, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। এমনকি শীর্ষ পদের বেতন এক লাফেই দ্বিগুণ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। কোনো সরকারের আমলেই বিমান লাভজনক ছিল না। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহীর বেতন অন্য যেকোনো সংস্থার চেয়ে বেশি।