বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্সে আটক ৫৬৫, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে দেশজুড়ে গতকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ লিয়ঁ, মার্সেই, বোর্দো, রেন, গ্রেনোবল, নঁতসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

 বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়। দিনভর অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিকেল ও সন্ধ্যায় কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৪০ হাজার পরিচয় ও নিরাপত্তা তল্লাশি চালিয়ে ৫৬৫ জনকে আটক করা হয়েছে। 

এদিকে আন্দোলনকারীরা আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ৬ ও ৭ নভেম্বর ধর্মঘট অব্যাহত রাখা, বিভিন্ন স্থানে অবরোধ এবং নতুন কর্মসূচি পালনেরও ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েলো ভেস্ট (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনের সমন্বয়করা।

ফ্রান্সে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সামগ্রিক সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনের পর ২৪ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর ছিল আন্দোলনের তৃতীয় বড় জাতীয় কর্মসূচি। এই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম, উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক সংগঠন এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমন্বয়করা যুক্ত হয়েছেন। শুরুতে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্দোলন জোরালো হলেও পরবর্তী সময়ে শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, শ্রমিকদের বেতন ও পেনশন বৃদ্ধি, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য জনসেবায় বরাদ্দ বাড়ানো। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, সরকারি বাজেটের ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত পুলিশি ব্যবস্থা বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। 

সরকারি ও আয়োজকদের হিসাবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর হিসাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর আন্তঃসংগঠনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।
রাজধানী প্যারিসে সরকারি হিসাবে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার। 

তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, সেখানে প্রায় ২ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভে সরকারি হিসাবে দেশজুড়ে ৪ লাখ ১০ হাজার এবং প্যারিসে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ফলে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচিতে আগের সপ্তাহের তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে। 

প্যারিসে বিক্ষোভের রুট নিয়ে আইনি লড়াই রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের মিছিলের রুট নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। আয়োজকদের প্রস্তাবিত বাস্তিল থেকে নেশন পর্যন্ত ঐতিহাসিক মিছিলের রুট প্রশাসন অনুমোদন করেনি। পরবর্তী সময়ে পোর্ত দ্য বাগনোল থেকে পোর্ত দ্য শারঁতন পর্যন্ত বিকল্প পথে মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হয়। 

এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ও পক্ষে প্রশাসনিক আদালতে আইনি প্রক্রিয়াও চলে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত বিকল্প রুটের অনুমোদন বহাল রাখে। মিছিলের শেষ পর্যায়ে পোর্ত দ্য শারঁতন এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। একই সময়ে বাস্তিল চত্বর ও রু দ্য লা রোকেত এলাকায় অনুমোদিত মিছিলের বাইরে ছোট ছোট জমায়েতের খবর পাওয়া যায়। 

সামনে আরও আন্দোলনের কর্মসূচি ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ৬ ও ৭ নভেম্বর অবরোধ, ধর্মঘট অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন স্থানে নতুন কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।

 আন্দোলনকারীদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। ফলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত