প্রচ্ছদ রচনা

জন্মশতবর্ষ : ‘উলটো কথা’য় অ্যালেন গিন্সবার্গ

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

‘উলটো কথা’ শব্দবন্ধটি নেওয়া হয়েছে কবি মণীন্দ্র গুপ্তের একটি বইয়ের নাম থেকে। ‘উলটো’ ব্যাপারটা আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। শুধু রথযাত্রায় আমাদের মন ভরে না। উলটো রথযাত্রার ব্যবস্থাও থাকতে হয়। কবি ও কবিতাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজমান। কবিতাপাঠের বিচিত্র রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে দুনিয়ায়। মোটা দাগে এসব প্রবণতাকে দুটি ধারায় বিন্যস্ত করা যায়। প্রথম ধারাটি কবিতার ভাষা ও অর্থ নির্মাণে কবির একাধিপত্যকে স্বীকার করে। এটি কবিতার ইতিহাসকেই পাঠের প্রধান ও প্রায় পরম বিবেচনাবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বিপরীতে, দ্বিতীয় ধারাটি কবিতার সৃজন ও আস্বাদন—উভয় প্রক্রিয়াকেই জনগোষ্ঠীর ভাষা, জীবনাচার, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও সামষ্টিক চৈতন্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে দেখতে চায়। তবে বাঙালি পাঠকদের কথা আলাদা। বরাবরই তারা কালেকটিভ কনশাসনেসে চলতে পছন্দ করে। বিশ্বসাহিত্যের অনেক বড় বড় নামের সঙ্গে হয়তো সে পরিচিত নয়। তবে অল্পতেই তাদের বুঁদ হতে দেখা যায় কোনো বিশেষ ব্যক্তিতে বা ঘটনায় বা রটনায়। কখনো কখনো প্রতিভার বিচ্ছুরণ কতটুকু হয়েছে তা না জেনেই। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত দুটি ধারার কোনটি প্রযুক্ত হবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারত ক্রিটিক্যাল জায়গা থেকে। তবে প্রত্যাশিতভাবেই সেটা হয়নি বাঙালিদের চিরন্তন খাসিলত মেনে। তাদের কাছে মস্তিষ্কের আরাম খোঁজা এক অনন্য আনন্দরস, বহুকেলে বাতিক। গিন্সবার্গের গভীরতা তারই নিজস্ব। তার প্রতিটি শব্দ একদা জনমানসে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছিল। কবিতার চেয়ে জীবনযাপনের রীতিপদ্ধতিও পাঠক-সমাজকে নাড়িয়েছিল। শতভিষা গোষ্ঠীর প্রধান কাণ্ডারী অলোক রায় খানিকটা খোঁচা দিয়ে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন : ‘গোলমালটা বেশি হলো গিন্সবার্গ এখানে আসার পর। গিন্সবার্গের পাল্লায় পড়ে ওদের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। গিন্সবার্গের মতো ওরাও মনে করতে শুরু করল, জীবনযাপনই কবিতা। ওদের যা মনে হতো ওরা তাই করতে শুরু করল। যেতে যেতে একটা পাহাড়কে গিলে ফেললাম। তা খাওয়া যায় হয়তো, আস্ত জাহাজও গিলে ফেলা যায়।’ কৃত্তিবাসের কবিদের সঙ্গে শতভিষার সম্পর্কের প্রশ্নেই তিনি মন্তব্যটি করেছিলেন। বিশ্বময় হিংসা, অসহিষ্ণুতা, আগ্রাসী ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে দর্শন ও বীক্ষা, লেখক বা শিল্পীসত্তার সততা বা ভণিতা সম্পর্কিত কথাগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তার অকপট সাক্ষাৎকারে। বাংলাদেশের কবিতামোদীরা অবশ্য সরাসরি তার কবিতার মাতাল সরণিতে পা রেখেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বলতে গেলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সৌজন্যেই তারা চিনেছে গিন্সবার্গকে। তারপর ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটির জন্য। এর বাইরে আলাদা করে এদেশে গিন্সবার্গকে যাপন করার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো কিছু চোখে পড়েনি। বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য সেই বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্ব ও উদাসীনতা পেরিয়ে বিট প্রজন্মের গিন্সবার্গের কবিতা-পাঠের একপ্রস্থ অফবিট প্রসঙ্গের সন্ধান করা।

২
লেখক রাজীব দত্ত এক লেখায় জানিয়েছেন : নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজজীবনে প্রবেশের সময়, বাংলা ভাষায় অনূদিত মলয় রায়চৌধুরীর অ্যালেন গিন্সবার্গ-এর কবিতা শীর্ষক ক্ষীণকায় পুস্তিকাটির মধ্য দিয়েই অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ঘটে। বাকি পাঠকদের অবস্থাও মোটাদাগে এরকমই। ‘কবিতা পাক্ষিক’ থেকে প্রকাশিত এই সংকলনে ‘হাউল’, ‘বাস্তব সিংহ’ ও ‘আমেরিকা’—মাত্র তিনটি কবিতার অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মলয়ের আশ্চর্য অনুবাদে গিন্সবার্গের কবিতার যে বিদ্রোহী স্বর ধরা পড়েছিল, তা বহু বাঙালি তরুণ পাঠক ও কবির কল্পনাজগৎকে আলোড়িত করেছিল। ইন্টারনেট ও গুগলবিহীন সেই সময়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনসহ শহরের বিভিন্ন গ্রন্থাগার ছিল বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অন্যতম অবলম্বন। গিন্সবার্গকে ঘিরে ছড়িয়ে থাকা নানা বিতর্ক, গুজব, হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ও কৃত্তিবাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক তার জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন, মার্কিন পুঁজিবাদের বিরোধিতা, সামাজিক ভণ্ডামি ও প্রথাগত সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বিশ্বব্যাপী গণ-আন্দোলনের প্রতি সংহতির মধ্য দিয়ে গিন্সবার্গ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদী চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তার ‘হাউল’ ও ‘ক্যাডিশ’-এর মতো কবিতার তীব্র, স্বতঃস্ফূর্ত ও অনুভূতিঘন উচ্চারণ তরুণ বাঙালি কবিদের কাছে নতুন কাব্যভাষা ও জীবনবীক্ষার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছিল। 

৩
অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিমানস নির্মাণে পারিবারিক পরিমণ্ডল, শৈশবের অভিজ্ঞতা, বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় পাঠ এবং সংগীতের গভীর প্রভাব বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তার বাবা লুই গিন্সবার্গ ছিলেন গীতিকবি ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। অন্যদিকে মা নাওমি ছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী। ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া গিন্সবার্গের বাল্য ও কৈশোর কাটে নিউ জার্সির প্যাটারসনে। এখানেই প্রখ্যাত মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৯৪৮ সালে তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তী সময়ে উইলিয়ামসের সঙ্গে নিয়মিত পত্রালাপ। এটাও গিন্সবার্গের সাহিত্যিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করা এই কবির পাঠপরিধিতে ধ্রুপদি গ্রিক, হিব্রু ও খ্রিস্টীয় সাহিত্য থেকে শুরু করে মিলটন, এডগার অ্যালান পো, পার্সি বিশি শেলি ও উইলিয়াম ব্লেকের রচনা স্থান পেয়েছিল। সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও তার জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছিল।

গিন্সবার্গের কাব্যচেতনার গভীরে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন দুই কবি—উইলিয়াম ব্লেক ও ওয়াল্ট হুইটম্যান। ১৯৪৮ সালের জুন মাসে ব্লেকের কবিতা পাঠের সময় তার এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয়েছিল বলে তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। ঘুমঘোরে ‘Songs of Innocence and of Experience’ থেকে ‘The Sick Rose’ নয়, বরং ‘Ah! Sun-flower’ কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো যেন ব্লেকের কণ্ঠেই শুনতে পেয়েছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা কবিতাকে শুধু ভাষাশিল্পের সীমা অতিক্রম করে এক গভীর প্রত্যক্ষ উপলব্ধির জগতে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্লেকের কবিতায় সুরারোপ করে গিন্সবার্গ তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ব্লেককে তিনি আধুনিকতার প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরেও এক দূরদর্শী কবি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তিব্বতি সাধক ও কবি মিলারেপার সঙ্গেও ব্লেকের তুলনা টেনেছিলেন তিনি। একজনের মধ্যে দেখেছিলেন ভবিষ্যদ্দ্রষ্টার প্রজ্ঞা, অন্যজনের মধ্যে মহাজাগতিক উপলব্ধি।

তবে গিন্সবার্গের কাছে হুইটম্যান ছিলেন এক অর্থে আধ্যাত্মিক পিতা। হুইটম্যানের Leaves of Grass-এ যে মুক্ত, বিস্তৃত ও ব্যক্তিস্বীকারমূলক কাব্যভাষা নির্মিত হয়েছিল, গিন্সবার্গ তার উত্তরাধিকার গ্রহণ করেন নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও সময়ের সংকটের মধ্য দিয়ে। তার কবিতার দীর্ঘ পঙ্‌ক্তিবিন্যাস, স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ এবং ব্যক্তিগত অনুভবকে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরের প্রবণতায় হুইটম্যানের প্রভাব স্পষ্ট। হুইটম্যানকে উদ্দেশ করে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে ‘I Love Old Whitman So’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গিন্সবার্গের কাছে কবিতা ছিল নিজের দেখা, শোনা ও অনুভব করা জীবনের অকপট লিপিবদ্ধকরণ। ব্লেক ও হুইটম্যানের পাশাপাশি ফিওদর দস্তয়েভস্কি এবং জোহান সেবাস্তিয়ান বাখও গিন্সবার্গের মনোজগতে গভীর ছাপ রেখেছিলেন। আর ছাপ রেখেছিল বৌদ্ধ দর্শন ও লালন। ব্লেকের সঙ্গেও লালনের তুলনা করে তিনি একাধিক লেখা লিখেছেন। 

৪
‘বিট প্রজন্ম’ ধারণাটির জন্ম পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়। ১৯৫০-৫১ সালে সমকালীন প্রজন্মের স্বরূপ নিয়ে জ্যাক কেরুয়াক ও জন ক্লেলন হোমসের মধ্যে আলোচনার সূত্রে শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য প্রকাশিত হয়। কেরুয়াক এই প্রজন্মের কোনো সুসংহত, একরৈখিক চরিত্র নির্ধারণের প্রচেষ্টাকে নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন : ‘আ., বিট প্রজন্ম ছাড়া কিছুই নই আমরা।’ ১৯৫২ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাময়িকীতে জন ক্লেলন হোমস ‘দিস ইজ দ্য বিট জেনারেশন’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সেই সূত্রেই ‘বিট প্রজন্ম’ কথাটি একটি বিশেষ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতার পরিচায়ক হয়ে ওঠে। ‘বিট’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিঃস্বতা, ক্লান্তি, সামাজিক প্রত্যাখ্যান ও অস্তিত্বের অতল সংকটের অভিজ্ঞতা। চল্লিশের দশকের গোড়ায় নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ‘আমি একজন বিট’ বলার অর্থ ছিল : পকেটে অর্থ নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দীর্ঘ অনিদ্রা ও অবসাদে জীবন বিপর্যস্ত। সমাজের প্রচলিত কাঠামোও তাকে স্বীকার করছে না। তবে ‘বিট’ মানে শুধু বিপর্যস্ত বা নিঃশেষিত হওয়া বোঝায় না। সমস্ত আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন অভিজ্ঞতার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দেওয়া এর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এই উন্মুক্ততা অনেকটা ওয়াল্ট হুইটম্যানের ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ ভাবনায় বিনম্রতা, আত্মসমর্পণ এবং জীবনের গভীরতর সত্যকে উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষা একসূত্রে গাঁথা।

গণমাধ্যম যখন ‘বিট’ শব্দটির অর্থকে সম্পূর্ণ পরাজয় কিংবা বাদ্যযন্ত্রের ছন্দের সঙ্গে একাকার করে দেখতে শুরু করে, কেরুয়াক তখন শব্দটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তিনি ‘বিট’-এর সঙ্গে be-at, beatitude ও beatific ধারণার সম্পর্ক নির্দেশ করে এর আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনাকে সামনে আনেন। তার ব্যাখ্যায়, বিট এমন এক অস্তিত্বগত অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সত্তার অন্ধকার ও অজ্ঞতার আবরণ অপসারিত হয়ে উদ্ভাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অহংকারের সংকোচন ঘটে, চেতনা উন্মুক্ত হয় এবং ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পথ প্রশস্ত হয়। এ না বুঝলে তো গিন্সবার্গের কবিতা বোঝা যাবে না। এটা যেন সপ্তদশ শতকের কবি স্কারোঁর এপিটাফের শেষ ছত্রের পূর্ণ বিপ্রতীপ! কমলকুমার মজুমদার তার ‘গোলাপসুন্দরী’ কাহিনিতে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন—‘পথিক শব্দ করিও না কারণ এই প্রথম রাত্রে স্কারোঁ ঘুমায়।’ অবশ্য গিন্সবার্গ বোঝার ক্ষেত্রে কাব্যসৃষ্টির উৎসস্থলের পরিবর্তন বোঝাও জরুরি।

৫
১৯২৭ সালে Université des Annales-এ কবিতা ও কাব্যতত্ত্ব বিষয়ে প্রদত্ত ‘কবিতাবিষয়ক কিছু মন্তব্য’ শীর্ষক বক্তৃতায় পল ভালেরি কবিতার বহুমাত্রিক রূপময়তা ব্যাখ্যা করতে পেন্ডুলামের একটি অন্তর্দীপ্ত রূপক ব্যবহার করেন। তার কল্পনায়, কাব্যপাঠের সময় পাঠকের মন একবার দুলে যায় ধ্বনি, ছন্দ, সুরবিন্যাস ও আঙ্গিকের অভিনব শরীর-সংস্থানের দিকে, আবার ফিরে আসে কবিতার বিষয় ও অর্থের অভিমুখে। এই দুই মেরুর মধ্যে অবিরাম দোলনের মধ্য দিয়েই কবিতার সঙ্গে পাঠকের একটি জৈব সংযোগ গড়ে ওঠে এবং উপলব্ধি ক্রমশ পূর্ণতা লাভ করে। ভালেরি স্পষ্ট করেছিলেন, গদ্য রচনার সামগ্রিক প্রয়াসের সঙ্গে কবিতার প্রকৃতিগত পার্থক্য এখানেই। 

ভালেরির পেন্ডুলাম-রূপক সম্পর্কে আবু সয়ীদ আইয়ুব লিখেছিলেন : ‘পাঠকের মন পেন্ডুলামের দোলকের মতো একবার ফর্ম থেকে কনটেন্টের দিকে দুলে যায়, আবার সেখান থেকে ফর্মের দিকে ফিরে আসে।’ অন্যদিকে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘এইভাবে বুঝিয়েছিলেন ভালেরি। কবিতার ভাষাকে তিনি তুলনা করেছিলেন এক পেন্ডুলামের সঙ্গে, ভাব আর রূপের মধ্যে অবিরাম দুলছে যে পেন্ডুলাম।’ ভালেরির এই কল্পনা দুই ভাবুককেই আকর্ষণ করেছিল, যদিও তাদের অবস্থান ছিল বিপরীতমুখী। রবীন্দ্র-কবিতায় ‘গদ্যপরিণাম’ নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে এই পেন্ডুলাম-তত্ত্বের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গিন্সবার্গের কবিতার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন নতুনভাবে উত্থাপিত হয় : কবিতার বক্তব্য ও সামাজিক তাৎপর্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, আর কতটা গুরুত্ব পাবে তার ধ্বনিগত, ছন্দগত ও আঙ্গিকগত নির্মাণ? স্মরণ করা যেতে পারে সুনীলের সঙ্গে বেনাপোল সীমান্ত দেখতে গিয়ে শরণার্থী স্রোতের যে নারকীয় দৃশ্য তিনি দেখেছিলেন তার কথা। খান মহম্মদ ফারাবির অনুবাদে সেই কবিতার প্রাসঙ্গিক অংশ উদ্ধৃত করা হলো : ‘সময় চলেছে রাজপথ ধরে যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল,/ সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, গরুগাড়ি কাদা রাস্তা পিচ্ছিল/ লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে,  লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়,/ ঘরহীন ভাসে শত শত লোক, লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।/ রিফিউজি আর খিদে পাওয়া শিশু, পেটগুলো সব ফুলেফেঁপে ওঠে/ এইটুকু শিশু এতবড়ো চোখ দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে।’

গিন্সবার্গের কাব্যিক সাফল্য বক্তব্যকে উচ্চারণের ছন্দে এবং উচ্চারণকে বক্তব্যের রাজনৈতিক ও নান্দনিক অভিঘাতে রূপান্তরিত করার মধ্যেই।

৬
বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতার আঙ্গিক ও কবিতাপাঠের প্রচলিত রীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন। গদ্যঘন, কথোপকথনধর্মী ও স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণে নির্মিত তার কবিতা মার্কিন কবিতায় এক নতুন ভাষারীতির সূচনা করে। এই নবনির্মাণে তার সহযোগী ছিলেন উইলিয়াম বারোজ, জ্যাক কেরুয়াক, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, পিটার অরলোভস্কি, গ্যারি স্নাইডার, গ্রেগরি কোরসোসহ বিট আন্দোলনের একঝাঁক কবি ও লেখক। পরবর্তী সময়ে কবিতাপাঠে সংগীত ও যন্ত্রাণুষঙ্গের সংযোজন গিন্সবার্গের পরিবেশনাকে স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়। বেনারসে ভজনগায়কের কাছে হারমোনিয়াম শেখার অভিজ্ঞতাও তার কবিতাপাঠে ভারতীয় সংগীতের অনুরণন সৃষ্টি করেছিল। কলকাতায় ‘আমজাদিয়া হোটেলে’ কাটানো সাত মাস তার জীবন ও বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাউল অশোক ফকির, কৃত্তিবাসের কবিগোষ্ঠী ও হাংরি আন্দোলনের কবিদের সান্নিধ্যে কলকাতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। সেই বর্ণময় সময়ের স্মৃতিচিত্র পাওয়া যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়। তবে দিন শেষে তিনি মার্কিন কবি এটা বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই। অকপটে তাই তিনি লিখতে পেরেছেন : ‘একাকিত্ব, সমাজবিরোধিতা, সমকাম, চেনা মূল্যবোধ থেকে চেনা পাপবোধ, এসব ছিঁড়ে ফেলা এবং হস্তমৈথুনের পরম প্রাপ্তি।’

কবিতায় তিনি উদ্দাম-উন্মত্ত যৌনতা, নাগরিক সভ্যতার কৃত্রিম নৈতিকতা, সামাজিক অনুশাসন ও প্রচলিত শুচিবোধের বিরুদ্ধে অপূর্ব অশ্লীল সব উচ্চারণ করে গেছেন। যৌনাঙ্গ, বীর্য, অণ্ডকোষ, অ্যালকোহল ও মাদকদ্রব্যের পুনঃপুন উল্লেখের মধ্য দিয়ে কবি মানুষের শরীরকে সভ্যতার আরোপিত পবিত্রতার কৃত্রিম আবরণ থেকে মুক্ত করেছেন। জ্যাজ, সেক্স, স্যুপ কিংবা পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি যৌনতার উপস্থিতি জীবনযাপনের বিচিত্র অনুষঙ্গকে একই সমতলে নিয়ে আসে। এখানে শরীর একই সঙ্গে ভোগের, যন্ত্রণার, আত্মবিনাশের ও মুক্তির ক্ষেত্র। বিট প্রজন্মের প্রতিবাদী চেতনায় যৌনতার এই প্রকাশ সামাজিক ট্যাবু ভাঙার পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতার উগ্র আকাঙ্ক্ষাকেও প্রতিফলিত করে।

৭
দিনশেষে এক বিস্তৃত উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়েই গিন্সবার্গকে মার্কিন কবিতার এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে বোঝা যায়। হুইটম্যান, এমিলি ডিকিনসন, লংফেলো ও পো থেকে শুরু করে রবার্ট ফ্রস্ট, ওয়ালেস স্টিভেন্স, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, এজরা পাউন্ড, মারিয়ান মুর, টি. এস. এলিয়ট ও ল্যাংস্টন হিউজেস—বহু কবির সৃজনশীল অর্জনে নির্মিত হয়েছিল সেই ঐতিহ্য। গিন্সবার্গের স্বাতন্ত্র্য হলো, তিনি এই উত্তরাধিকারকে অনুকরণে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ও সামাজিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন যুগের উপযোগী করে তুলেছিলেন। তার পবিত্র ও রাগী অন্যস্বরের গরিমা এখানেই। বড় অংশের পাঠকের কাছে তা পৌঁছাক বা না পৌঁছাক। অজস্র সোজা কথার ভিড়ে একটু না হয় শোনাই হলো উলটো কথার পদশব্দ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত