বেল জার বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্মস্পর্শী সৃষ্টি। এক তরুণী, এস্থারের মানসিক বিষাদ ও অবসাদের গল্প, পশ্চিমী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন সংবেদনশীল প্রতিভাবান নারীর আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের আখ্যান। প্রধানত নারীবাদ এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সমালোচনা করা হয়েছে। মূল চরিত্র এস্থার গ্রিনউডের মাধ্যমে সিলভিয়া প্লাথ গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মার্কিন সমাজে নারীদের ওপর আরোপিত দ্বিমুখী প্রত্যাশাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সে সময় মার্কিন নারীদের কাছ থেকে আশা করা হতো যে, তারা ভালো ছাত্রী হবে এবং একই সঙ্গে সুনিপুণ লক্ষ্মী গৃহিণী হয়ে থাকবে, সন্তান লালন-পালন করবে এবং পুরুষের অধীন জীবন মেনে নেবে। কিন্তু এস্থার এই বাধাধরা ছকে নিজেকে মেলাতে পারে না। তার স্বপ্ন কবি হওয়া। সমাজ নির্ধারিত ‘আদর্শ নারীর’ সঙ্গে তার নিজের মতো হয়ে ওঠা নারীর দেখা দেয় তুমুল দ্বন্দ্ব। উপন্যাসটি হয়ে ওঠে নারীবাদী সাহিত্যের যুগান্তকারী সংযোজন।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি এই উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এই উপন্যাসের আরও বড় গুরুত্ব হলো—মানসিক অসুস্থতা বা ডিপ্রেশনকে লুকিয়ে না রেখে অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সে যুগে মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনকে কোনো রোগ হিসেবে দেখা হতো না, বরং একে ব্যক্তিক দুর্বলতা বা নৈতিক পতন বলে মনে করা হতো। এস্থার যখন মানসিক সমস্যায় ভোগে, তখন দেখা যায়, সেই সময়ের চিকিৎসা পদ্ধতির নির্মম রূপ এবং সমাজের অন্ধ কুসংস্কার তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। প্লাথ দেখিয়েছেন কীভাবে সামাজিক লজ্জা ও গোপনীয়তার ভয়ে মানসিক রোগীরা কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
‘বেল জার’ বা কাচের জার হচ্ছে এক ধরনের রূপক। উপন্যাসের নামকরণ এবং এর কেন্দ্রীয় রূপকটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যবাহী।
বেল জার হচ্ছে এক ধরনের কাচের ঢাকনা, যা সাধারণত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত কোনো নমুনা বা মৃত উপকরণ ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। এস্থার অনুভব করে, সে যেন একটি অদৃশ্য কাচের জারের নিচে বন্দি। বাইরের পৃথিবী চলছে তার নিজস্ব গতিতে, কিন্তু জারের ভেতরে আটকে থাকা এস্থারের চারপাশের বাতাস ফুরিয়ে আসছে, সে নিশ্বাস নিতে পারছে না। এই রূপকটি মূলত মানুষের চরম একাকিত্ব, বিষণ্ণতা এবং দম বন্ধ করা মানসিক বন্দিত্বের নিখুঁত ছবি।
সিলভিয়া প্লাথ সারা জীবন আত্মপরিচয় ও আত্মআবিষ্কারের সংকটে ভুগেছেন। এস্থার গ্রিনউডের জীবনও যেন নানা সম্ভাবনার এক গোলকধাঁধা, যাকে সে উপন্যাসে একটি ডুমুর গাছের রূপক ব্যবহার করে বুঝিয়েছেন। ডুমুর গাছের প্রতিটি ডালে নারীদের ভবিষ্যৎ ডুমুর হয়ে ঝুলছে—কেউ বউ হতে চায়, কেউ কবি, কেউ বা শিক্ষক। কিন্তু এস্থার একটি ডাল বেছে নিতে গিয়ে দ্বিধায় ভুগে ডালের ফলগুলো চোখের সামনে পচে ঝরে পড়তে দেখে। এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং নিজের প্রকৃত অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার আর্তি আধুনিক তরুণ সমাজের চিরন্তন সংকট।
তবে এসব ছাপিয়ে উপন্যাসটির আত্মজৈবনিক আবিষ্কার ও সাহিত্যিক মূল্য পাঠক এবং সমালোচকদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। উপন্যাসটি সিলভিয়া প্লাথের নিজের বাস্তব জীবনের ওপর অবলম্বন করে লেখা। এস্থারের মানসিক অবসাদের অভিজ্ঞতা মূলত প্লাথের নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার মাত্র এক মাস পর প্লাথ আত্মহত্যা করেছিলেন। ফলে দ্য বেল জার এক প্রতিভাবান কবি-জীবনের মর্মন্তুদ আখ্যান হিসেবে চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা পেয়ে গেছে।
বেল জার প্রচলিত অর্থে শুধু উপন্যাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, একই সঙ্গে নারীস্বাধীনতা, মানসিক সুস্থতা এবং অস্তিত্বের সংকটকে প্রতিফলিত করেছে। কীভাবে ভেতরের ও বাইরের যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেও একজন মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, উপন্যাসটি তারই বর্ণনা।
নিষিদ্ধের ইতিবৃত্ত
প্রথম আপত্তি ছিল চরিত্রগুলোর যৌনতা নিয়ে। চরিত্রগুলোকে দেখা যায় যৌনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করছে। সেই সঙ্গে তারা ‘আপত্তিকর’ জীবনধারাকে সমর্থন করে বলে মনে করা হয়েছিল। একটি ঘটনায়, মূল চরিত্র মন্তব্য করে, তার বয়ফ্রেন্ডের যৌনাঙ্গ তাকে হতাশ করছে। এই অঙ্গটি তাকে ‘টার্কি মুরগির ঘাড় এবং গিলা-কলিজার’ কথা মনে করিয়ে দেয়। উপন্যাসের কলেজছাত্রীরা যৌন-অভিজ্ঞতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। মূল চরিত্রটি ডায়াফ্রাম কেনে ও অচেনা কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক খোঁজে। এ রকম খোলামেলা অশ্লীলতার বাইরেও উপন্যাসটি আপত্তিকর হয়ে উঠেছিল খোলাখুলিভাবে প্রথাগত বিয়ে এবং মাতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে। বিয়েকে প্লাথ একঘেয়ে গৃহস্থালি কাজের কারাগার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মায়েদের বর্ণনা করেছেন পরিশ্রান্ত দাসী হিসেবে, যেখানে স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের কাছে অনুগত থাকে ও নিচু জীবনযাপন করে।
১৯৭৭ সালে ইন্ডিয়ানার ওয়ারশতে, ওয়ারশ কমিউনিটি স্কুলের উঁচু ক্লাসের প্রথম বর্ষের ইংরেজি শিক্ষিকা তেরেসা বার্নাউকে ‘উইমেন ইন লিটারেচার’ (সাহিত্যে নারী) নামের একটি ঐচ্ছিক কোর্স পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কোর্সটিতে পূর্ব-অনুমোদিত বইপত্র ব্যবহার করার কথা বলা হয়। সেপ্টেম্বরে স্কুল শুরু হওয়ার আগে প্রিন্সিপাল বার্নাউকে পাঠ্যতালিকা থেকে গ্রোয়িং আপ ফিমেল ইন আমেরিকা এবং দ্য স্টেপফোর্ড ওয়াইভস উপন্যাসটি বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। বইগুলো ‘কমিউনিটির কেউ নারীদের প্রথাগত ভূমিকার প্রতি সমালোচনায় ক্ষুব্ধ হতে পারে’ ভেবে সরিয়ে ফেলা হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি আবার প্রিন্সিপাল নির্দেশ দেন, গো আস্ক অ্যালিস বইটিও তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ এতে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার আছে। নভেম্বরে প্রিন্সিপাল দ্য বেল জার বইটি পর্যালোচনা করার পর এবং এতে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির (ডায়াফ্রাম) কথা আছে এবং ‘গালাগাল বা অশালীন ভাষা’ ব্যবহার করা হয়েছে বিবেচনা করে একে ‘অনুপযুক্ত’ বলে পাঠ্যতালিকা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। বার্নাউ এই বইগুলোর পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু তাকে এই বলে সতর্ক করা হয়েছিল যে, তিনি যদি বইটি অন্তর্ভুক্ত করেন, তবে তাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বরখাস্ত করা হবে। বার্নাউ সেই নির্দেশ মেনে নিলেও প্রিন্সিপাল পরে বলেন যে, দ্য বেল জার ব্যবহার না করতে বলার পরও স্কুলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষক ‘ক্ষোভ ও নেতিবাচক মনোভাব’ প্রদর্শন করেছেন। স্কুল বোর্ড বার্নাউকে শিক্ষকতার পদ থেকে সরিয়ে দেয়। তারা মনে করেছিল তিনি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ‘বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গির’ পরিচয় দিয়েছেন।
তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সবাই মেনে নেননি। ওয়ারশ কমিউনিটি হাইস্কুলের ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এবং তার পরিবার স্কুল বোর্ডকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ১৯৭৯ সালের গোড়ার দিকে, ব্রুক জাইকান, তার ভাই ব্লেয়ার এবং তাদের বাবা-মা মামলা করেন। মামলায় স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অধিকার সংক্রান্ত ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয় এবং আদালতকে স্কুল বোর্ডের বই সরানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করার আবেদন জানায়। যে বইগুলো তখন সরানো হয়েছিল সেই বইগুলোর মধ্যে দ্য ফেমিনাইন প্লুরাল : স্টোরিজ বাই উইমেন অ্যাবাউট গ্রোয়িং আপ এবং দ্য নিউ উইমেন : অ্যা মোটিভ অ্যান্থোলজি অব উইমেনস লিবারেশন শীর্ষক দুটো বই ছিল। এই বিতর্ক সামলাতে এবং শ্রেণিকক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের ভাষায় ‘নোংরা’ উপাদান দূর করা এবং তাদের নিজস্ব এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘পিপল হু কেয়ার’ নামে একটি দল গঠন করা হয়। তাদের এক সদস্য তখন বলেন, ‘স্কুলের সিদ্ধান্ত খ্রিস্টীয় বিধানের ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা উচিত।’ ‘জাইকান বনাম ওয়ারশ (ইন্ডিয়ানা) কমিউনিটি স্কুল করপোরেশন এবং ওয়ারশ স্কুল বোর্ড অব ট্রাস্টি’ (১৯৮০) মামলায় বাদীরা অভিযোগ করেন, স্কুল বোর্ড শ্রেণিকক্ষ থেকে বইগুলো সরিয়ে দিয়েছে ‘বইগুলোতে ব্যবহৃত শব্দ সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক রুচিতে আঘাত করেছিল বলে, সামগ্রিক শিক্ষার অভাবে নয়।’
মামলার সঙ্গে যুক্ত আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের আইনজীবী আশা করেছিলেন, রাজ্য শিক্ষাগত স্বাধীনতাকে (অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম) প্রথম সংশোধনীর অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, স্কুলের কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের ‘জানার অধিকার’ এবং শিক্ষাগত স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তাকে লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ানা ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট এই দাবিগুলো খারিজ করে মামলাটি বাতিল করে দেয়। বাদীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও কোর্ট অব আপিলস স্কুল বোর্ডের পক্ষ নেয় এবং ঘোষণা করে যে, স্কুল বোর্ড কারও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেনি। তারা মনে করে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্তরে ‘স্বাধীনতা’র অধিকার সীমিত। ১৯৮০ সালের ২২ আগস্ট ওই শহরের সার্কিট কোর্টের বিচারক ওয়াল্টার জে. কামিংস রায় দেন, ‘এ ধরনের স্বাধীনতার প্রতি শিক্ষার্থীদের অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের স্তর দ্বারা সীমাবদ্ধ।’ তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় স্কুল বোর্ডের কাছে হাই স্কুলের শ্রেণিকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করার অনেক ক্ষমতা রয়েছে। মামলাটি স্কুলের লাইব্রেরি এবং শ্রেণি শিক্ষককে বই নির্বাচন ও অপসারণের ক্ষেত্রে স্কুল বোর্ডগুলোর কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে এবং স্কুল কাঠামোর মধ্যে যারা শিক্ষাগত স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা প্রদান করে। আর এভাবেই বেল জার নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়।
নিষিদ্ধ শব্দবাণ
দ্য বেল জার
‘নিষিদ্ধ শব্দবাণ’ বিশ্বসাহিত্যের সেইসব বইয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, যেগুলো কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শিক গোষ্ঠী কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নিষিদ্ধ, বিতর্কিত বা দমনের শিকার হয়েছিল। প্রতিটি পর্বে তুলে ধরা হবে একটি বইয়ের প্রকাশ-ইতিহাস, নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক গুরুত্বের পুনর্মূল্যায়নের গল্প
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-১
জিভাগোর ইতিকথা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-২
লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৩
লোলিতা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৪
দ্য ম্যানিফেস্টো অব দ্য কমিউনিস্ট পার্টি
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৫
অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৬
আন্না ফ্রাঙ্কের ডায়েরি
মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
গ্রাফিক্স : দেশ রূপান্তর
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০