বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (সিইপিএ) আলোচনা সফলভাবে শেষ হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্পের বহুমুখীকরণে সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের লজিস্টিকস, জাহাজ নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। গত ২ নভেম্বর সিউলে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্কের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সিইপিএ নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রচলিত বস্ত্র ও তৈরি পোশাকনির্ভর অংশীদারত্বের বাইরে গিয়ে কোরিয়ার সঙ্গে আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি ইলেকট্রনিকস ও সেমি-কন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পকে সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া জ্বালানি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, আধুনিক উৎপাদনশিল্প ও অবকাঠামো খাতে কোরীয় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও কোরীয় প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রী। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা, ইলেকট্রনিকস শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা এবং কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রম সহজ ও গতিশীল করা।
কৌশলগত অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের বিষয়ে তার দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা ও আগ্রহের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সহজ করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কোরীয় পক্ষ একটি সমন্বিত তালিকা বাংলাদেশকে দিতে সম্মত হয়েছে।
বাংলাদেশ সফরকারী প্রতিনিধিদল সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
হুন্দাই গ্লোভিসের প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বক ও প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন ও অটোমোটিভ খাত নিয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। এ সময় লজিস্টিকস হাব, বন্দর, অর্থনৈতিক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, অটোমোটিভ সরবরাহব্যবস্থা এবং স্মার্ট লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়।
এদিকে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুন ও প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল সংযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের জন্য স্যামসাংকে আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্টও বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী বলেন, সিইপিএ-পরবর্তী সুযোগকে বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে বাংলাদেশ কোরিয়া সরকার ও কোরীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ-কোরিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পের বহুমুখীকরণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের আরও গভীর সংযুক্তি যার মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য নতুন প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয় দেশই পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুযোগ পাবে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে, যা উভয় দেশের টেকসই উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।