মাঠের ফুটবলার উন্মাদনা আর করতালির উচ্ছ্বাস মুহূর্তেই রূপ নিল এক অচেনা বিষাদে। স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে তেনেরিফে ও অ্যান্ডোরার মধ্যকার লড়াইয়ে বল দখলের এক তীব্র দ্বৈরথে ঘটে গেল ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা। অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক জেসুস ওউয়োনোর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন তেনেরিফের ৩০ বছর বয়সী উদীয়মান ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগেল।
গত সোমবার ম্যাচের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে গোলপোস্ট ছেড়ে ছুটে আসা গোলরক্ষকের হাঁটু সজোরে আঘাত করে মিগেলের বুকে। মুহূর্তেই মাঠের মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। হারানো হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা এবং হাসপাতালে নেওয়ার পরদিন সকালেই মারা যান তিনি।
ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে গোলের জন্য লড়াই কিংবা শারীরিক সংস্পর্শের ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে এই মর্মান্তিক পরিণতি পুরো স্প্যানিশ ফুটবলকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ম্যাচ চলাকালীন ঘটা এই অনভিপ্রেত মৃত্যুর ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ওওনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি এবং ম্যাচটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে এখানেই শেষ নয়; মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে এই দুর্ঘটনা এখন রূপ নিয়েছে এক জটিল আইনি ও ফৌজদারি লড়াইয়ে। স্পেনের জাতীয় পুলিশের হত্যাকাণ্ড তদন্ত বিভাগ এবং বিচার বিভাগ এই আকস্মিক মৃত্যুর পেছনে গোলরক্ষকের কোনো গুরুতর অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
স্পেনের আইন অনুযায়ী অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্পেনের দণ্ডবিধির ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গুরুতর অবহেলার কারণে কারও মৃত্যু ঘটলে ১ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলাধুলার মাঠে স্বাভাবিক খেলার অংশ হিসেবে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার জন্য গোলরক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অত্যন্ত দুরূহ হবে। সান্তা ক্রুজ দে তেনেরিফের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি হোসে লুইস সানচেজ-হাউরেগিও স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফইকে জানিয়েছেন যে, খেলা চলাকালে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনায় ফৌজদারি মামলা আদালতে বিচারের পর্যায়ে নেওয়া বেশ কঠিন। এদিকে ঘটনার আকস্মিকতায় মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া গোলরক্ষক ওউয়োনো ড্রেসিংরুমে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করে রাত কাটিয়েছেন এবং নিহত ফুটবলারের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
তদন্তের আইনি মারপ্যাঁচ এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত
মাঠের মধ্যকার কোনো ঘটনার জেরে ফুটবলারের কারাদণ্ডের সম্ভাবনা নিয়ে স্পেনের আইন ও ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইসের সঙ্গে কথা বলার সময় এই আইনি জটিলতা ব্যাখ্যা করে আইনবিশেষজ্ঞ মারিয়ানা গালভান বলেন, ‘এখানে তদন্তের তিনটি দিক রয়েছে, ক্রীড়া, ফৌজদারি ও শ্রমসংক্রান্ত। এর মধ্যে ফৌজদারি বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুতর। ওওনোর পক্ষে একটি বিষয় রয়েছে, সেটি হলো সংঘর্ষের সময় বল খেলার মধ্যে ছিল। আমরা এখনই এটিকে দুর্ঘটনা বলতে পারি না। তবে গোলরক্ষকের কর্মকাণ্ড এবং ক্রীড়াসংক্রান্ত দিকটি পরীক্ষা করতে পারি।’
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত শুরু হয়েছে এবং কী ঘটেছিল, তার ব্যাখ্যা দিতে গোলরক্ষককে আদালতে হাজির হতে হবে।’
আইনি বাধ্যবাধকতা
ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে এই মামলার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন স্থানীয় প্রসিকিউটর। সান্তা ক্রুজ দে তেনেরিফের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি হোসে লুইস সানচেজ-হাউরেগি সংবাদ সংস্থা ইএফই-কে দেওয়া মন্তব্যে জানান যে, খেলার মাঠে স্বাভাবিক খেলার গতিপ্রকৃতির মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ করা বেশ কঠিন। তবে আইন অনুযায়ী নিহত খেলোয়াড়ের পরিবার যদি এই তদন্তের ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়, তবে তাদের নিজস্ব উদ্যোগে অভিযোগ দায়ের করার আইনি সুযোগ রয়েছে।
মাঠের শাস্তি এবং ইউরোপজুড়ে শোকের আবহ
ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলাবিধির ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মাঠে সহিংস বা মারাত্মক আচরণের জন্য বড় ধরনের ক্রীড়াশাস্তির মুখেও পড়তে পারেন ওউয়োনো। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচার করে তাকে সর্বোচ্চ ১২ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হতে পারে। এদিকে এই অকালপ্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা উয়েফা। উয়েফার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার সেফেরিন দে মিগেলের পরিবার, সতীর্থ এবং তেনেরিফ ক্লাবকে সান্ত্বনা জানিয়ে এক বার্তার মাধ্যমে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ) সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে নির্ধারিত বেশ কিছু ম্যাচ স্থগিত করেছে এবং এই সপ্তাহের সব ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় এক মিনিট নীরবতা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গোলরক্ষকের ধাক্কায় স্প্যানিশ ফুটবলারের মাঠেই মৃত্যু