যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা ব্যালটে তার নাম না দেখলেও, যেন তাকেই সামনে রেখে ভোট দেন। তিনি বারবার সেই আহ্বানও জানিয়েছিলেন। দেশটির ভোটাররা তার কথা রেখেছেন। তবে ফল হয়েছে ঠিক উল্টো। ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানানোর বদলে ব্যালটের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক মিত্রদের প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সর্বত্র রিপাবলিকানদের পরাজয়ের যে ঢেউ উঠেছে, তা শুধু কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যই বদলে দিচ্ছে না। পাশাপাশি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও। দুই বছর আগে যে ভোটারদের সমর্থনে তিনি হোয়াইট হাউজে ফিরেছিলেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ডেমোক্র্যাটরা অপ্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছেন।
জর্জিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের পাশাপাশি আইওয়া, ক্যানসাস, টেক্সাস, এমনকি সাউথ ক্যারোলাইনার মতো রিপাবলিকান দুর্গেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। ট্রাম্পের বিতর্কিত নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের কৌশলও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনাই রিপাবলিকানদের বিপদ বাড়িয়েছে। নির্বাচনের ফল ডেমোক্র্যাটদের জন্য কয়েকটি ঐতিহাসিক অর্জনও এনে দিয়েছে। জর্জিয়ায় কেইশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী। অন্যদিকে টেক্সাসের প্রথম লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কেবল কোন দল কতটি আসনে জিতেছে, তা নয়। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের গভীর অসন্তোষ, পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা এবং ট্রাম্পের প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ভোটার জরিপে দেখা গেছে, প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ কিংবা অসন্তুষ্ট। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ তীব্র। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন ভোটার মনে করেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দামের জন্য মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিই দায়ী। এই অসন্তোষ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে ট্রাম্পের ভোটার জোটে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে যে সমর্থন তিনি পেয়েছিলেন, এবার তার বড় একটি অংশ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সরে গেছে। ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট; কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে পড়বে। কারণ গত দুই বছর রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস থেকে তাকে খুব কম বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এই নির্বাচনের প্রভাব কেবল ওয়াশিংটনের ক্ষমতার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী দুই বছর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট; উভয় দলের রাজনীতি কোন পথে এগোবে, তার গতিপথও নির্ধারণ করে দিতে পারে এই ফল।
২০২৪ সালে ট্রাম্পের জয়ের অন্যতম ভিত্তি ছিল শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী ভোটারদের সমর্থন। পাশাপাশি তরুণ ও অশ্বেতাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশও রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকেছিল। দুই বছর আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবার তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকানদের সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিসের সমর্থন ছিল প্রায় সমান। অথচ এবারের নির্বাচনে জাতীয়ভাবে এই বয়সী প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় সাতজন জানিয়েছেন, তারা প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও একই পরিবর্তন দেখা গেছে।